মুদ্রার রেকর্ড দরপতনের কারণে গত বছর ২৮ ডিসেম্বর থেকে বিক্ষোভে কাঁপছে ইরান। জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর দাবিতে শুরু হওয়া সে বিক্ষোভ কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের ইসলামি শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটানোর আন্দোলনে পরিণত হয়। ইরান জুড়ে চলমান অস্থিরতা ও বিক্ষোভের পরিস্থিতি এখন ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গতকাল সোমবার তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ দাবি করেন। এ সময় আরাগচি বলেন, খুব শিগগিরই দেশ জুড়ে ইন্টারনেট আবার চালু করা হবে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব তাকে ফোন করে আলোচনায় বসতে চেয়েছে। গত রবিবার ট্রাম্প বলেন, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে চেয়ে ফোন করেছে। ট্রাম্পের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ইরান সরকার বলেছে, তারা যুদ্ধ চায় না, তবে যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের বেশিরভাগই বিক্ষোভকারী। তবে রয়টার্স নিহতের সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, দেশব্যাপী বিক্ষোভের রক্তক্ষয়ী দমন-কার্যক্রমের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তিনি আরও দাবি করেন, বিক্ষোভগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘সহিংস ও রক্তক্ষয়ী’ করা হয়েছিল যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হস্তক্ষেপ করার একটি সুযোগ পান। তবে আরাগচি এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, শিগগিরই দেশে ইন্টারনেট পুনরায় চালু করা হবে। সরকার নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এ বিষয়ে অগ্রগতি করছে। তিনি জানিয়েছেন, দূতাবাস এবং সরকারি দপ্তরগুলোর ইন্টারনেট সংযোগও পুনঃস্থাপন করা হবে। ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানো বিক্ষোভের পর গতকাল সোমবার নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে ধর্মতান্ত্রিক শাসনের সমর্থনে রাজপথে নামতে দেখা গেছে সরকারপন্থি বিক্ষোভকারীদের। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সেই মিছিলের দৃশ্য প্রচার করা হয়। সেখানে মিছিলে সমর্থকদের ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘ইসরায়েলের মৃত্যু হোক’ বলে সেøাগান দিতে দেখা গেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরান এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এ কথা তার হুমকির পর এসেছে, যেখানে তিনি ইরানের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে চেয়ে ফোন করেছে। এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প আরও বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারি। একটি বৈঠক আয়োজন করা হচ্ছে। কিন্তু এ বৈঠকের আগেই যা ঘটছে তার কারণে হয়তো আমাদের ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। দেশটির বিরোধী পক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ২০২২ সালের পর এবারই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের মুখে ইরানের সরকার। ট্রাম্প বারবার হুমকি দিয়ে বলছেন, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই হুমকির মুখে ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে জানালেও বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে। গতকাল ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ কথা নিশ্চিত করে জানিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গতকাল বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম খোলা রয়েছে এবং যখনই প্রয়োজন হচ্ছে বার্তা বিনিময় করা হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যস্থতাকারী সুইজারল্যান্ডের মাধ্যমেও যোগাযোগের পথ খোলা আছে বলে তিনি জানান। তবে বাঘাই অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা পরস্পরবিরোধী বার্তা থেকে বোঝা যায় তারা এ বিষয়ে আন্তরিক নয়।
ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায় সামরিক পদক্ষেপসহ বিভিন্ন বিকল্প খতিয়ে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার ট্রাম্প তার উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেনÑ সেখানে ইরান বিষয়ে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে বিকল্প পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে, সামরিক হামলা, গোপন সাইবার অস্ত্রের ব্যবহার, নিষেধাজ্ঞা বৃদ্ধি এবং সরকারবিরোধী পক্ষগুলোকে অনলাইন সহায়তা প্রদান করা। ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের অভিযোগে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরকার পতনের একদফা দাবিতে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ৫৩৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত বিক্ষোভের জেরে ১০ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি। রয়টার্স অধিকার সংস্থার দাবি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি।
