রক্তাক্ত ইরান

‘চোখের সামনেই পাখির মতো গুলি করে মারা হচ্ছে’

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৭ এএম

ইরানে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সাধারণ ও নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা একে ‘একতরফা যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। বর্তমানে দেশটিতে ইন্টারনেট সেবা ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।

নিরাপত্তার স্বার্থে নাম পরিবর্তন করা ‘ওমিদ’ নামক এক বিক্ষোভকারী জানান, দক্ষিণ ইরানের একটি ছোট শহরে তিনি নিজের চোখে নিরাপত্তা বাহিনীকে কালাশনিকভ রাইফেল দিয়ে সরাসরি মিছিলে গুলি চালাতে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা খালি হাতে এক নৃশংস শাসনের বিরুদ্ধে লড়ছি। মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ছিল।’

তেহরানের এক তরুণী গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, শুক্রবার (১০ জানুয়ারি) ছিল একটি ‘রক্তাক্ত দিন’। তার ভাষ্যমতে, ‘শুক্রবার নিরাপত্তা বাহিনী কেবল হত্যা আর হত্যাই করেছে। এটি কোনো যুদ্ধ নয়, কারণ যুদ্ধে দুই পক্ষের কাছে অস্ত্র থাকে। এখানে শুধু মানুষ স্লোগান দিচ্ছে আর মারা পড়ছে।’

নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআরএনজিও) জানিয়েছে, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৪৮ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৯ জন শিশু রয়েছে। তবে স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কয়েকশ থেকে কয়েক হাজারে পৌঁছাতে পারে।

অন্যদিকে, ইরান সরকার এখন পর্যন্ত কোনো স্বচ্ছ পরিসংখ্যান দেয়নি। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, বিক্ষোভকারীদের হামলায় ১০০ জন নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছেন। সরকার বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাসী’ হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেছে যে, তারা বহু মসজিদ ও ব্যাংকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

বিবিসি পারসিয়ানের প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, হাসপাতালগুলো আহত ও নিহতের চাপে হিমশিম খাচ্ছে। তেহরানের কাহরিজাক ফরেনসিক সেন্টারের ভিডিওতে দেখা গেছে, কালো ব্যাগে মোড়ানো লাশের সারি পড়ে আছে। স্বজনরা পর্দায় অজ্ঞাতপরিচয় লাশের ছবি দেখে প্রিয়জনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।

মাশহাদ শহরের এক মর্গ কর্মী জানান, শুক্রবার সূর্যোদয়ের আগে ১৮০ থেকে ২০০টি ক্ষতবিক্ষত মরদেহ সেখানে আনা হয়েছিল এবং দ্রুত দাফন করা হয়েছে। রেশত শহরের একটি সূত্র জানায়, সেখানে মরদেহ হস্তান্তরের বিনিময়ে নিরাপত্তা বাহিনী স্বজনদের কাছ থেকে ‘বুলেটের দাম’ দাবি করছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র পিছু হটবে না।’ তার এই বার্তার পরই দমন-পীড়ন আরও জোরালো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইরানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইরানে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত মাই সাটো বলেন, ‘নিহতের সংখ্যা যাই হোক না কেন, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

বর্তমানে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে বড় শহরগুলো থেকে কিছু তথ্য আসলেও ছোট শহরগুলোর পরিস্থিতি অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

সূত্র: বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত