সাবেক খাদ্যমন্ত্রীর পছন্দের ব্যবসায়ীতেই ভরসা!

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪৫ এএম

রাশিয়া থেকে নিম্নমানের গম বেশি দামে কেনার জন্য পছন্দের দুজন ব্যবসায়ীর ওপর ভরসা করতেন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। কারণ তিনি এর মাধ্যমে সুবিধাভোগী ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নানা দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক এই মন্ত্রী এখন কারাগারে। তবে বদলায়নি পরিস্থিতি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ওই ব্যবসায়ীদের ওপর ভরসা করে রাশিয়া থেকে এমওপি সার আমদানি করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। রাশিয়া থেকে সরকারি বেসরকারিভাবে সার আমদানিতে এই ব্যবসায়ীদ্বয় স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে বছরের পর বছর ধরে কাজ করছেন। অথচ তাদের বিরুদ্ধে নিম্নমানের গম বেশি দামে কেনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।  

গতকাল রাজধানীর কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে (বিএআরসি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রাশিয়া ফেডারেশনের ৩০ হাজার টন এমওপি (মিওরেট অব পটাশ) সার উপহার হিসেবে হস্তান্তর করা হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে। সেই অনুষ্ঠানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম, যুগ্ম সচিব খোরশেদ আলমসহ ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন। তবে এ অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির সভাপতি মিঞা সাত্তার ও তার ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল। 

জানা গেছে, মিঞা সাত্তার জ¦ালানি খাতের পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং আমিরুজ্জামান সোহেল প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। যারা দুজনেই সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তিতে স্থানীয় এজেন্ট, নেগোশিয়েটর হিসেবে ভূমিকা রাখতেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় এক দশক ধরেই তারা রাশিয়া থেকে সরকারিভাবে আমদানি হওয়া এমওপি সারের চুক্তির ক্ষেত্রে নেগোশিয়েটর বা স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তারা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জেএসসি ফরেন ইকোনমিক করপোরেশনের (প্রডিনটর্গ) স্থানীয় এজেন্ট। এদের সঙ্গে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সার আমদানির চুক্তি করেছে। সরকারিভাবে এমওপি এবং নন-ইউরিয়া সার আমদানির জন্য চুক্তি করে থাকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। 

এদিকে বিএআরসির অনুষ্ঠানেও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা লক্ষ করা যায়। মিঞা সাত্তার এই অনুষ্ঠানে বক্তব্যও দেন। উপদেষ্টা তার বক্তব্যে মিঞা সাত্তারের প্রশংসাও করেন। অনুষ্ঠানের শেষভাগে স্টেজে মিঞা সাত্তারকে উপদেষ্টার সঙ্গে কানে-মুখে কথা বলতেও দেখা যায়। অনুষ্ঠানস্থলেও উপস্থিত অনেকেই তাদের উপস্থিতি এবং বিগত সময়ে গম কেনায় প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেন। তবে নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।

জানা গেছে, বেশি দামে সরকারিভাবে গম আমদানি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে ২০২২ সালে। যখন রাশিয়ার প্রডিনটর্গ থেকে পাঁচ লাখ টন গম কেনার চুক্তি করে। খাদ্য অধিদপ্তর প্রতি টন গম সরকারি চুক্তির আওতায় ৪৩০ ইউএস ডলারে কেনার চুক্তি করে। যখন গমের বাজারদর ছিল ৩৮০ মার্কিন ডলারের মতো। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী বেড়ে যাওয়া দাম যখন কমতে শুরু করেছিল ঠিক তখনই সরকার বেশি দামে গম কেনার চুক্তি করে। এটা নিয়েই গণমাধ্যমসহ নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। কারণ ৫০ ডলার করে বেশি দাম দিয়ে গম কেনার ফলে তখনকার ডলারের মূল্যমান অনুযায়ী সরকারের প্রায় ২৪০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়।

জানা যায়, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দুই ভাই মিঞা সাত্তার ও আমিরুজ্জামান সোহেলের মালিকানাধীন কোম্পানি ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপ রাশিয়ার প্রডিনটর্গের বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিনিধি বা এজেন্ট ছিল। এখনো তারা একই প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট হিসেবেই কাজ করছে। তবে বাড়তি মনোযোগ সারের ক্ষেত্রে।

শুধু এই পাঁচ লাখ টনই নয়, ২০২২ সাল থেকে ১১ লাখ টন গম আমদানির ক্ষেত্রে খাদ্য অধিদপ্তর অতিরিক্ত খরচ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যার মূল্য ছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। জানা যায়, ২০১৫ সালে কামরুল ইসলাম খাদ্যমন্ত্রী থাকার সময় ব্রাজিল থেকে পোকা খাওয়া ও নিম্নমানের গম আমদানি নিয়ে ব্যাপক হইচই হয়েছিল। এরপর সরকার গমের প্রোটিনের মান সাড়ে ১১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ১২ শতাংশ করে। কিন্তু সাধন চন্দ্র মজুমদার খাদ্যমন্ত্রী থাকাকালে ২০২২ সালে আবারও প্রোটিনের পরিমাণ কমিয়ে সাড়ে ১১ শতাংশ করে। যার মাধ্যমে নিম্নমানের গম আমদানির সুযোগ তৈরি হয়। আর এই সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল মূলত ঘনিষ্ঠ এই দুই ব্যবসায়ীর স্বার্থে।

শুধু তাই নয়, এ ঘটনায় সুবিধাভোগী হয়েছিল সরকারি কর্মকর্তারা। সে সময় দুই বছরে প্রডিনটর্গের অর্থায়নে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ১৭ কর্মকর্তা রাশিয়া সফর করেন। তখন টিআইবি এক বিবৃতি দিয়ে বাড়তি দামে গম কেনা এবং ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের গম কেনার দর নির্ধারণে ভূমিকা থাকার বিষয়ে সমালোচনা করা হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাশিয়া থেকে সার আমদানিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেভাবে এই দুই ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা ছিল, এখনো সেটাই আছে। এতটুকু প্রভাব কমেনি। যদিও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বরাবরই দাবি করে আসছেন, কৃষি মন্ত্রণালয় সার আমদানিতে পুরনো সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত