জামায়াতের ছাড়ের আসন নিয়ে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৫ এএম

জোটের জন্য ছেড়ে দেওয়া অনেক আসনে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ আর হতাশা দেখা গেছে। এজন্য বিক্ষোভ মিছিল এবং দলীয় প্রার্থীকে অবরুদ্ধ করে রাখার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এজন্য জোটের প্রার্থীদের জন্য ছাড় দেওয়া কয়েকটি আসনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারেনি দাঁড়িপাল্লার মনোনীত প্রার্থীরা।

তবে দলের নেতারা বলছেন, নেতাকর্মীদের আবেগ-অনুভূতির কারণে দুই এক জায়গায় কিছু সমস্যা হয়েছে। এটা কখনোই ক্ষোভ না। দিন শেষে জামায়াতের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী জোট মনোনীত প্রার্থীর জন্য কাজ করবে। এক্ষেত্রে কেউ কোনো শিথিলতা দেখাবে না।

তারা আরও বলছেন, বৃহত্তর ঐক্য ধরে রাখতে এবং এক ভোট বাক্স নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই তারা এসব আসনে ছাড় দিয়েছে। জোট টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে জামায়াত। তবে দলের সেই সিদ্ধান্ত সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

তৃণমূলে জামায়াত ও শিবিরের সমর্থকরা প্রকাশ্যেই প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। বিশেষ করে গত ১৫ জানুয়ারি ১০ দলের আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত ও ছাত্রশিবির সমর্থকদের মধ্যে নানা মন্তব্য ও সমালোচনা চলছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কয়েকটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা সরে দাঁড়াননি। কিছু কিছু জায়গায় শরিক দলের প্রার্থীও রয়ে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌলভীবাজার-৩ সংসদীয় আসনে ১০ দলীয় জোট থেকে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আহমদ বেলালকে চূড়ান্ত করা হয়। এ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল মান্নান। তিনি যেন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে না পারেন এজন্য মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার নিজ বাড়িতে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।

মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময়ে সুনামগঞ্জ-১ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির তোফায়েল আহমেদ খানকে ৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন নেতাকর্মীরা। এই আসনে বাংলাদেশ নেজামে ইসলামী পার্টির কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব মাওলানা মুজাম্মিল হক তালুকদারকে (বই) জোটের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

নরসিংদী-২ আসনটি ১০ দলীয় ঐক্য এনসিপিকে ছেড়ে দিলেও জামায়াতের প্রার্থী আমজাদ হোসাইন শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। একইভাবে মনোনয়ন প্রত্যাহারের দিনে তিনি দলীয় কর্মী-সমর্থকদের দ্বারা নিজ বাসায় আটকে পড়েন। এই আসনে জোটের  প্রার্থী এনসিপির মো. গোলাম সারোয়ার (সারোয়ার তুষার)।

চট্টগ্রাম-৮ আসনেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই আসনে এনসিপির প্রার্থী মো. জোবাইরুল হাসান আরিফকে ১০ দলীয় জোট সমর্থন দিয়েছে। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু নাছের শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াননি। জামায়াত ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি দলের প্রার্থী সমঝোতার পরও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি বলে জানা গেছে।

১৯ জানুয়ারি সাভারের বাইপাইল এলাকায় ‘জুলাই যোদ্ধা’ ব্যানারে দিলশানা পারুলের মনোনয়ন প্রত্যাহার দাবিতে মানববন্ধন করেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। বক্তারা দিলশানার মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবি জানান। তাছাড়া কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থী নিয়ে সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন নেতাকর্মীরা। যা দলটির ইতিহাসে নজিরবিহীন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কেননা কেন্দ্রীয় সংগঠনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এর আগে এমন প্রতিক্রিয়া কখনোই দেখা যায়নি।

তাছাড়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়ত ও শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে। তৃণমূলের নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর তারা মানুষের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সাধারণ মানুষও তাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। সবাই দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে চায়। কিন্তু নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে অপরিচিত ও জনবিচ্ছিন্ন প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া নেতাকর্মীরা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না।

তারা বলেন, এরপরও কেন্দ্রীয় সংগঠনের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে কাজ করতে হবে। বৃহত্তর স্বার্থে জামায়াত এমন কোরবানি মেনে নিয়েছে বলে জানান তারা। চট্টগ্রামে এরই মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার কথা বলেছেন নেতারা।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনে জামায়াতের কোনো প্রার্থী থাকবেন না। দুই এক জায়গায় যারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেননি, তারাও প্রার্থী থাকবেন না। জোট থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তার পক্ষেই কাজ করবেন সবাই। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করা না করা আসনেও জামায়াতের পক্ষে কেউ ভোট চাইবে না বা প্রচার প্রচারণা করবে না। সংশ্লিষ্ট আসনের প্রার্থী ঘোষণা দিয়েই জোটের পক্ষে নামবেন। 

এক প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন, আমাদের নেতাকর্মীরাও মানুষ। তাদের মান-অভিমান থাকতে পারে। তবে দিন শেষে সংগঠনের সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবেন।

দলের মুখপাত্র এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, নেতাকর্মীরা নিজেদের টাকা খরচ করছেন, শ্রম দিয়েছেন তাই তাদের কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। আবার তার মানে এই না যে, তারা দলের সিদ্ধান্ত মানবেন না। বৃহত্তর স্বার্থে দলের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত মেনে চলবেন।

এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি ও দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, যেসব আসনে সমঝোতা থাকা সত্ত্বেও প্রার্থিতা প্রত্যাহার হয়নি, সেগুলো নিয়ে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছানো যাবে বলে আমরা আশাবাদী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত