নির্বাচিত সরকারের গলার কাঁটা হবে নতুন পে-স্কেল!

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম

পে-স্কেল তথা সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে নির্বাচিত সরকারের কাঁধে। এ চ্যালেঞ্জ হবে নতুন সরকারের জন্য ভয়াবহ কঠিন, হবে তাদের গলার কাঁটা! নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ বাড়তি ব্যয় ধরা হয়েছে বছরে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বেতন-ভাতায় ৮০ হাজার কোটি ও পেনশনে ২৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। দেশের আর্থিক সক্ষমতায় এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগান দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি নিশ্চয়ই প্রয়োজন। ২০তম গ্রেডের পিয়ন, দারোয়ান বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বর্তমান মাসিক মোট বেতন ১৭ হাজার টাকা, যা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। নতুন কাঠামোয় তাদের প্রস্তাবিত মাসিক আয় ধরা হয়েছে ৪২ হাজার টাকা।

প্রধান সমস্যা হলো এই বাড়তি ব্যয় মেটানোর উৎস। চলতি অর্থবছরের মোট বাজেট ৭ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা সরকারের পরিচালন ব্যয়, যার মধ্যে রয়েছে বেতন-ভাতা, পূর্বের ঋণ ও সঞ্চয়পত্রের সুদ-কিস্তি। ফলে বেতন-ভাতা ও পেনশনই এখন সরকারের প্রধান ব্যয়।

নতুন বেতন কাঠামোর জন্য বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার উৎস কী হতে পারে? উত্তর অনিশ্চিত হলেও সম্ভাব্য উপায় হচ্ছে দুটি-নতুন ঋণ নেওয়া অথবা ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধি করা। এছাড়া আরও দুটি বিপজ্জনক পথ থাকতে পারে-উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থগিত করা কিংবা অতিরিক্ত টাকা ছাপানো। টাকা ছাপানো সহজ সমাধান মনে হলেও এতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিকে ভেনেজুয়েলা বা জিম্বাবুয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আভ্যন্তরীণ ঋণ করেও এই ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়, কারণ ব্যাংকিং খাত ইতিমধ্যে সংকটে।

তাই শেষ ও একমাত্র বিকল্প হিসেবে ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধির পথ বেছে নিতে হতে পারে, যার বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপবে। ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি পেলে বাজারে টাকার জোগান বেড়ে যাবে, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে। অথচ বেসরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের আয় একই থাকবে। ফলে তাদের ওপর দাম ও কর-দুই ধরনের চাপ তৈরি হবে।

অন্তবর্তী সরকার নির্বাচনের আগে বেতন বৃদ্ধির এই যে সিদ্ধান্ত রেখে যাচ্ছে, তা পরের সরকারের জন্য একধরনের ‘আগাম বিদায়’ এর পথ তৈরি করতে পারে। বেতন বৃদ্ধি করা দরকার, কিন্তু তা করতে হবে সরকারের আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে। আগে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও জনবল কমানো জরুরি। অন্যথায়, জনগণের ধারণা-সরকারি কর্মচারীরা পর্যাপ্ত সেবা দেন না-এমন পরিস্থিতিতে বাড়তি করের চাপ দিলে সরকার জনরোষের মুখে পড়তে পারে।

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দলটির নেতা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে এই বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নও হবে তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বেতন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, পে স্কেল বাস্তবায়নে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এসব বিষয় পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে বাস্তবায়ন পদ্ধতি ঠিক করা হবে।

অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ পুরোপুরি বা আংশিক বাস্তবায়ন হতে পারে। অতীতেও ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানো হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কর্মচারীদের জীবনমান ও ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক। তবে একই সঙ্গে তাদের সেবার মান ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হওয়া দরকার। এটি তো আর একবারে বাস্তবায়ন করা যাবে না, তাই কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে তার একটি সময়সীমা সরকারকে দিতে হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের সঙ্গেও যেহেতু সরকারি কর্মচারীরাই জড়িত থাকেন, তাই কীভাবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি ফাঁকি রোধ করা যায় সেটির নিশ্চয়তাও দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত