জামায়াত-বিএনপি লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি

          দুটি আসনে বিএনপির চরম কোন্দল

          এক আসনে জোটের প্রার্থী দিয়ে ব্যাকফুটে জামায়াত

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২২ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাটোরের চারটি আসনের মধ্যে নাটোর-১ ও নাটোর-৩ আসনে বিএনপির কোন্দল তুঙ্গে। দুটি আসনেই দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটের মাঠে সক্রিয় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তারা ভোটের মাঠ ছাড়বেন না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। বিএনপির এ কোন্দলের কারণে আসন দুটিতে জামায়াতে ইসলামীর বিজয় অনেকটা নিশ্চিত বলে মাঠে-ময়দানে আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। অবশ্য শেষ মুহূর্তে নাটোর-৩ আসনটি এনসিপিকে ছেড়ে দিয়েছে জামায়াত। অন্যদিকে নাটোর-২ আসনটি বিএনপির জন্য নিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর নাটোর-৪ আসন ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের হওয়ায় সেখানে যেকোনো প্রার্থীই জয়ী হতে পারেন। সব মিলিয়ে নাটোরের চারটি আসনে এবার ভোটের জমজমাট লড়াই হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) : আসনটিতে ১৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা রয়েছে। এখানে বরাবরই আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বেশি শক্তিশালী। এ আসন থেকে বারবার নির্বাচিত জেলার প্রথম প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান পটল মারা যাওয়ায় ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান পটলের সহধর্মিণী অধ্যক্ষ কামরুন নাহার শিরিন। এবার তার মেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক পরামর্শক কমিটির বিশেষ সহকারী, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও নাটোর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। তবে তারই ভাই ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন। এ আসনে ভাইবোনের ভোটযুদ্ধ বেশ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে। অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা তাইফুল ইসলাম টিপুকে দল মনোনয়ন না দেওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করার ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী থেকে এখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে দলের উপজেলা আমির ও লালপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদকে। এ আসনে এবি পার্টির জেলা সদস্য সচিব এএসএম মোকাররেবুর রহমান নাসিম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আনছার আলী দুলাল ও সাম্যবাদী দলের মনজুরুল ইসলাম মিঠু প্রচার চালাচ্ছেন।

বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলমত নির্বিশেষে সবাই আমার জন্য প্রচার চালাচ্ছেন। আশা করছি বিপুল ভোটে জয়লাভ করব।

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, সাধারণ জনগণ আমার সঙ্গে রয়েছেন। কোনো পরিবারতন্ত্রের কাছে লালপুর-বাগাতিপাড়ার মানুষ জিম্মি হতে চায় না।

জামায়াত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ জানান, তিনি শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে মাঠে আছেন। জনগণের প্রতিনিধি হয়ে এর আগেও কাজ করেছেন। বিএনপির আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নির্বাচনে তিনি সহসাই বিজয়ী হবেন বলে মনে করেন।

নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা) : নাটোর-২ আসনটি (সদর-নলডাঙ্গা) ১২টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এ আসনে বারবার নির্বাচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবারও মনোনয়ন পেয়েছেন। বিএনপি নেতাকর্মীদের একমাত্র ভরসা এ নেতা। অন্যদিকে এ আসনে নাটোর জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক ইউনুস আলীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রার্থী প্রয়াত শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর কাছে খুব সামান্য ভোটে পরাজিত হয়ে নাটোরে সাড়া ফেলেছিলেন ইউনুস আলী। এ আসন থেকে এনসিপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে দলের জেলা আহ্বায়ক আব্দুল মান্নাফকে।

নির্বাচন নিয়ে দুলু বলেন, এই মুহূর্তে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আশা করি জয়লাভ করব।

জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক ইউনুস আলী বলেন, জনগণ পরিবর্তন চায়। সুষ্ঠু ভোট হলে ন্যায় ও ইনসাফের জয় হবে ইনশাআল্লাহ।

নাটোর-৩ (সিংড়া) : চলনবিল অধ্যুষিত নাটোর-৩ সিংড়া আসনটি ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এ আসনে বরাবরই বিএনপির অবস্থান শক্ত। একমাত্র জুনাইদ আহমেদ পলক ছাড়া এখানে আওয়ামী লীগ থেকে কেউ কখনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি। এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে সিংড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং স্থানীয় দমদমা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনুকে। তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক দাউদার মাহমুদ।

আনোয়ারুল ইসলাম আনুর হাতে ধানের শীষ থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন তিনি। দাউদার মাহমুদের সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ থাকায় তিনিও রয়েছেন মজবুত অবস্থানে। বিএনপির এ দুই প্রার্থীর শক্ত অবস্থানের কারণে তাদের অনুসারীদের মধ্যে ইতিমধ্যে একাধিক হামলা-মামলার ঘটনা ঘটেছে। দলের ভোট দুই ভাগ হয়ে যাওয়ায় নেতাকর্মীরা পড়েছেন বিব্রতকর অবস্থায়। এমন অবস্থায় জামায়াতে ইসলামী এখানে দলের প্রার্থী করেছিল নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সাইদুর রহমানকে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসনে জামায়াত থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রয়াত জামায়াত নেতা আবু বকর শেরকোলি। বিএনপির চরম কোন্দলের কারণে জেলা জামায়াতের নেতা অধ্যাপক সাইদুর রহমানের বিজয় সুনিশ্চিত এমন আলোচনা সবার মুখে মুখে। তবে এখানে ১০-দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা হয় জেলা এনসিপির সদস্য সচিব অধ্যাপক এএসএম জার্জিস কাদিরকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সখ্য ও আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করা এএসএম জার্জিস কাদিরকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ায় ভীষণ ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। জার্জিস কাদিরকে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। এরপর প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে নাটোরে সংবাদ সম্মেলন করেছে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা।

বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনু বলেন, সার্বিক বিবেচনা করে দল আমাকে মূল্যায়ন করেছে। আমি বিএনপির সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। দলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সবাইকে বিরোধ না করে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান এই নেতা।

নাটোর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক ড. মীর নুরুল ইসলাম বলেছেন, এটা জামায়াতের নিশ্চিত আসন। ১৯৯১ সালে এখানে জামায়াতের এমপি ছিল। তাদের সংগঠনও এখানে মজবুত। ১০-দলীয় জোট এনসিপির যাকে এখানে মনোনয়ন দিয়েছে, অতীতের নানা কর্মকাণ্ডের জন্য তার পক্ষে লোকজন কাজ করতে আগ্রহী নয়। তাকে বিজয়ী করা সম্ভব হবে না। এখনো যেহেতু সময় আছে, তাই জোটের শীর্ষ নেতাদের আসনটির বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) : নাটোর-৪ আসনটি ১৩টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ ও জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল হাকিম। স্বাধীনতার পর থেকে আসনটি বেশিরভাগ সময় আওয়ামী লীগের সাবেক জেলা সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুসের দখলে ছিল।

এ আসনে নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল হাকিম বলেন, আমি কাউন্সিলর ছিলাম, বড়াইগ্রাম উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলাম। জনগণের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করেছি। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমরা জয়লাভ করব।

অন্যদিকে বিএনপির আব্দুল আজিজ বলেছেন, গত ১৭ বছর এ আসনের নেতাকর্মীদের নিয়ে জনগণের পাশে ছিলাম। তাই সাধারণ ভোটাররা এবার আমাকেই নির্বাচিত করবেন বলে বিশ্বাস রাখি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার চারটি আসনের ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার ৭ লাখ ৭৬ হাজার ৫০৪ জন। চারটি আসনে ২ হাজার ৮৯৯টি বুথে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। জেলার ৫৬৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৪৪টি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত