নির্বাচনী অঙ্গীকারে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি কতটা স্পষ্ট

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২৫ এএম

সামনে নির্বাচন। সময় এসেছে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে জানার, দেশ চালানোর পরিকল্পনা কী? নীতিমালা কী? কোন পথে এগোবে বাংলাদেশ? শুধু স্লোগান বা আবেগ দিয়ে হবে না, জনগণের সামনে লিখিত, প্রকাশিত ও যাচাইযোগ্য নীতিমালা থাকা দরকার।

সম্প্রতি একটি দল নীতিমালা নিয়ে সম্মেলন করে বিভিন্ন খাতে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। এটা ভালো দৃষ্টান্ত। এই মুহূর্তে আমার অনুরোধ এবং নাগরিক দায়িত্ব থেকে দাবি, সব রাজনৈতিক দল, ইসলামি হোক বা অন্য যেকোনো, তাদের নেতৃবৃন্দ অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলুন। বিশেষ করে ইসলামের সঙ্গে মিল রেখে অর্থনৈতিক নীতি কেমন হবে সেটা নিয়ে। সবচেয়ে জরুরি হলো, রিবা বা সুদ বিষয়ে আপনাদের অবস্থান নীতিতে রূপ দিন এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন।

আমি যেটাকে বলছি ‘নো রিবা পলিসি’ বা সুদ নির্মূলের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা, এটা এমন একটা পরিকল্পনা, যেখানে পরিষ্কার থাকবে কীভাবে ধাপে ধাপে রিবা কমানো হবে, বিকল্প ব্যবস্থা কীভাবে দাঁড় করানো হবে, আর শেষ পর্যন্ত কীভাবে রিবা বন্ধ করে অর্থনীতিকে একটা ন্যায্য কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। সময়সীমা থাকবে, দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান থাকবে, অগ্রগতি মাপার সূচক থাকবে আর জনগণের সামনে বছরভিত্তিক রিপোর্ট থাকবে। এটাই ন্যূনতম প্রত্যাশা।

‘নো রিবা পলিসি’ মানে শুধু ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম বদলানো নয়। রিবা কমাতে বা সরাতে হলে অর্থনীতি পরিচালনার পুরো কাঠামোতে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও বাস্তব অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে পলিসি বানাতে হবে।

এর মানে হলো, রাষ্ট্র কীভাবে বাজেট করবে, সুদভিত্তিক ঋণ ছাড়া ঘাটতি কীভাবে সামলাবে, কর ব্যবস্থা এমনভাবে সাজাবে, যাতে উৎপাদন বাড়ে কিন্তু সাধারণ মানুষ চাপে না পড়ে। মুদ্রানীতিতে শরিয়াসম্মত পদ্ধতি থাকবে, যেন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে জনগণ সুদনির্ভর ব্যবস্থার বন্দি না হয়। বাজারে সিন্ডকেট, একচেটিয়া ব্যবস্থা ও নিত্যপণ্যের মজুদদারি ভেঙে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। এসএমই ও উদ্যোক্তাদের জন্য অংশীদারত্বভিত্তিক পুঁজি, কৃষকের জন্য ন্যায্য দাম আর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তরুণদের জন্য দক্ষতা আর চাকরির বাস্তব পরিকল্পনা, ইত্যাদি এসবই এর অংশ।

একই সঙ্গে জাকাত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও অডিট, জাকাত আর ট্যাক্স ব্যবস্থার মধ্যে স্মার্ট সমন্বয়, ওয়াক্ফকে উৎপাদনশীল করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসনে কাজে লাগানো, ক্যাশ ওয়াকফের কার্যকর ব্যবহার আর মর্যাদাপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা, এগুলোও ‘নো রিবা পলিসি’-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ ইসলামি অর্থনীতি মানে শুধু ফাইন্যান্স নয়, এটা ন্যায়ের অর্থনীতি।

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর মালয়েশিয়াতেও প্রথম ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন মালয়েশিয়া পুরো পৃথিবীতে ইসলামি ফিন্যান্স ইন্ডাস্ট্রিকে লিড করছে। সেখানকার ইসলামি ব্যাংকিং, ইসলামি ক্যাপিটাল মার্কেট, ইসলামি ফিনটেক, হালাল মার্কেট, একই সঙ্গে বিভিন্ন পলিসিতে এই বিষয়গুলোর গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাসহ সব জায়গায় রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে পৃষ্ঠপোষকতা আছে। প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় বাজেটে একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ এই জায়গায় বরাদ্দ করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে এ বিষয়গুলো দেখিনি।

আমরা কিছু রাজনৈতিক দলের অর্থনৈতিক নীতিমালা দেখেছি, তারা সুদমুক্ত ঋণের কথা বলেছেন, আমরা এর প্রশংসা করি। কিন্তু সুদমুক্ত ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, সুদমুক্ত অর্থায়নও দরকার। একটা সামগ্রিক ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। আমরা কীভাবে সেটাকে বাস্তবায়ন করব? এই বিষয়গুলো আমাদের সামনে দৃশ্যমান দেখছি না। হয়তো অনেক আলোচনা পর্দার পেছনে হতে পারে, আমরা সেটা জানি না। কিন্তু তা মানুষের সামনে আসা উচিত।

এতে প্রতিটি দলের রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকরা এই বিষয়ে আস্থা পাবেন যে, হ্যাঁ, আমি যেই রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিচ্ছি, নীতিমালার দিক থেকে তাদের এই বিষয়ে স্বচ্ছতা রয়েছে। আর এই নীতিমালাটা একটা শুরু, যেটা পুরো অর্থব্যবস্থায় ধাপে ধাপে ইসলামি অর্থনীতির মূলনীতিগুলোকে বাস্তবায়নের জায়গায় নিয়ে যাবে। একটা পর্যায়ে সুদ থেকে পুরো অর্থব্যবস্থাকে মুক্ত করার চেষ্টা করবে।

লেখক : মালয়েশিয়াবাসী বাংলাদেশি ইসলামি অর্থনীতিবিদ।

ফাউন্ডার, ডিরেক্টর ও সিইও আদল অ্যাডভাইজরি।

কো-ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর আইএফএ কনসালটেন্সি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত