ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখি

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৮ এএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন- যাদের ঘিরে আবর্তিত হয়েছে জাতির আশা, আকাক্সক্ষা এবং দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। তারেক রহমান সেই তালিকার শীর্ষ এক নাম। একদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে চরিত্র হননের চেষ্টা, অন্যদিকে তার ওপর চলেছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের স্টিমরোলার। সবকিছুকে উপেক্ষা করে তিনি দেশের অনিবার্য নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তিলে তিলে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ পরিক্রমা। ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখির মতো তিনি আজ শুধু বিএনপির কাণ্ডারি নন, বরং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর। আজ তিনি শুধু বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতা নন, বরং বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রতীক এবং আধুনিক, স্বনির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। তারেক রহমানের রাজনীতির মূল দর্শন বুঝতে হলে, আমাদের ফিরে যেতে হবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘উনিশ দফা’ কর্মসূচিতে। জিয়াউর রহমান বুঝেছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। তারেক রহমানও বাবার সেই দর্শনকে কেবল ধারণ করেননি, বরং তাকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে সাজিয়েছেন।

তারেক রহমান ২০০০ সালের শুরু থেকে দেশের প্রতিটি কোনায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি জানতেন, ভবিষ্যতে খাদ্য এবং জ্বালানি হবে বিশ্বরাজনীতির প্রধান অস্ত্র। আজ যখন আমরা বিশ্ব জুড়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্য সংকট দেখছি, তখন তারেক রহমানের সেই সময়কার কৃষি-উদ্যোগগুলোর মাহাত্ম্য বোঝা যায়। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশ এমন এক অবস্থানে পৌঁছাক, যেখানে খাদ্য সংকটের কারণে অন্য কোনো শক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে না হয়। তার পরিকল্পনায় ছিল আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, সারের সহজলভ্যতা এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, যা মূলত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষারই একটি অংশ। তিনি ব্যক্তিগতভাবে হাজার হাজার কর্মীর নাম ধরে খোঁজ নিতেন। সেই সময় ব্যক্তিগত যোগাযোগের কারণে সাধারণ কর্মীরা নিজেদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করেন এবং উপলব্ধি করেন, তারাই দলের মূল শক্তি। আর এতে যে এক অনন্য ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হয়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিগত ১৬ বছরের দুঃশাসনে। আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন নির্যাতন, গুম, খুন এবং হাজার হাজার মিথ্যা মামলার পাহাড়ও বিএনপির তৃণমূলের কর্মীদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। এর একমাত্র কারণ ছিল তারেক রহমানের প্রতি তাদের অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা।

নেতাকর্মীরা যখন দেখেছেন তাদের নেতা নির্যাতিত হয়েও মাথা নত করেননি, তখন তারাও মনোবল হারাননি। আজ বিএনপি যে ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকেও সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী দল, তার মূল কারিগর তিনিই। ২০০৮ সালে চিকিৎসার প্রয়োজনে, লন্ডন যাওয়ার পর থেকে তার রাজনৈতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। লন্ডনের নিভৃত জীবনে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। সেখানে তিনি বিশ্ববিখ্যাত লাইব্রেরিগুলোতে সময় কাটিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন এবং আধুনিক গণতন্ত্রের বিভিন্ন মডেল নিয়ে গবেষণা করেছেন। লন্ডনে থাকা অবস্থায় তার মধ্যে যে রাজনৈতিক পরিপক্বতা এসেছে, তা তার সাম্প্রতিক প্রতিটি বক্তব্যে স্পষ্ট। তিনি এখন প্রতিহিংসার বদলে ‘জাতীয় ঐক্য’ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেন। এই পরিবর্তনই আভাস দিচ্ছে যে, তিনি আগামীতে এক শান্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চান। তার নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় গুণ হলো ধৈর্য এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। তিনি বুঝতে পেরেছেন, কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন হলে দেশের ভাগ্য বদলাবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন। এ কারণেই তিনি ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’ ঘোষণা করেছেন। তারেক রহমান কেবল দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অত্যন্ত দক্ষভাবে নিজের ও দলের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি সফলভাবে বিশ্ব মোড়লদের বোঝাতে পেরেছেন যে, বিএনপি একটি উগ্রবাদী দল নয়, বরং এটি একটি আধুনিক, উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি।

আওয়ামী লীগে ১৫ বছরের শাসন ছিল লুটপাট ও রাষ্ট্রীয় অর্থ পাচারের এক মহোৎসব। ব্যাংক খাত থেকে শুরু করে মেগা প্রজেক্টের নামে যে পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। তারেক রহমান তার প্রতিটি বক্তৃতায় সুশাসনের ওপর জোর দিচ্ছেন। তিনি প্রস্তাব করেছেন এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার, যেখানে দুর্নীতি করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগ যেখানে প্রশাসনকে দলীয় ক্যাডারে পরিণত করেছিল, তিনি সেখানে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছেন। তিনি তরুণ প্রজন্মের জন্য মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে দলীয় পরিচয় নয় বরং যোগ্যতাই হবে মূল মাপকাঠি। ২০২৪ সালের বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার যে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে, তার নেপথ্যে দীর্ঘদিনের যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম কারিগর তারেক রহমান। তিনি ছাত্রদল ও যুবদলকে এমনভাবে পুনর্গঠন করেছেন যে তারা রাজপথে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আজ এক আইকন। কারণ তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে প্রতারণা নয়, বরং প্রকৃত ফ্রিল্যান্সিং উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের কথা বলেন। তারেক রহমান প্রমাণ করেছেন, সত্য ও নিষ্ঠা থাকলে অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় ফেরা সম্ভব। তার রাজনৈতিক জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে। সামনের দিনগুলোতে তারেক রহমানের কাঁধেই অর্পিত হতে যাচ্ছে জাতিকে সঠিক পথে পরিচালনার ভার। ফিনিক্স পাখির মতো তার জাগরণ কেবল বিএনপির বিজয় নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের আকাক্সক্ষার বিজয়।

লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা ও সদস্য, জিয়া পরিষদ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত