নারী কর্মীদের ওপর হামলায় জামায়াতের উদ্বেগ

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

সারা দেশে জামায়াতসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নারী কর্মীদের নির্বাচনী কাজে বাধা প্রদান, সহিংস হামলার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে সারা দেশে নারী কর্মীদের ওপর হামলার বিবরণ দিয়েছে দলটি। গতকাল মঙ্গলবার দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের সারা দেশে নারী কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা প্রকাশ করেন।

এ সময় দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের উপস্থিত ছিলেন।

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমন একটি দল, যাদের ৪৩ শতাংশ মহিলা এবং এ সংখ্যা কম নয়, আলহামদুলিল্লাহ। আরপিওতে ৩৩ শতাংশ মহিলা থাকার বিধান আছে রাজনৈতিক দলগুলোর। একমাত্র জামায়াতই এই শর্তটি পূরণ করতে পেরেছে।

তিনি বলেন, এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মহিলারা খুবই অ্যাকটিভ। আমাদের মহিলারা স্ব স্ব এলাকায় বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। আমাদের অ্যাসেসমেন্ট হলো সারা দেশের নারী ভোটাররা জামায়াতকে বেশি ভোট দেবেন। কারণ মহিলারা শান্তিপ্রিয় এবং তারা বিশৃঙ্খলা ও উগ্রতাকে পছন্দ করেন না। আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বুঝতে পেরেছে যে, জামায়াতের মহিলারা যে পরিমাণ অ্যাকটিভ, তাতে মহিলাদের সিংহভাগ ভোট জামায়াত পাবে। এজন্যই তারা সারা দেশে আমাদের মহিলাদের ওপর আক্রমণ করছে, হেনস্তা করার চেষ্টা করছে, ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এতে সারা দেশে একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা সবসময় এটা মনে করি নারীরা আমাদের অত্যন্ত সম্মানীয় জাত। আমাদের মায়ের জাত, আমাদের বোনের জাত, আমাদের মেয়ের জাত এবং তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবারই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যারা বেশি বেশি চিৎকার করে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার কথা বলে, তারা এখন দেখছি শুধু রাজনৈতিক কারণে নারীদের ওপর হামলা করছে এবং এটা শুধু নারীদের ওপর করছে না সারা দেশে নারী-পুরুষ সবার ওপরই হামলা শুরু হয়েছে। প্রতিপক্ষের জিহ্বা কেটে দেওয়ার কথা বলছে, জামায়াতকে ভোট দিলে হাত নিয়ে যেতে পারবে না এমন কথা বলছে। রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা এগুলো শুনতে পাচ্ছি।

সারা দেশে জামায়াতসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নারী কর্মীদের নির্বাচনী কাজে বাধা প্রদান, সহিংস হামলার বিবরণ ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ করছি, দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বাচন কর্মকাণ্ডে যুক্ত নারীরা, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরা ধারাবাহিকভাবে হামলা, মারধর, অপমান, ভয়ভীতি ও সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। এটি নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট একটি গভীর জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, যাদের ওপর হামলা হচ্ছে, তারা এক দলের নারী; আগামীকাল তারা অন্য যেকোনো দলের হতে পারে, হতে পারে আমাদেরই মেয়ে, বোন বা ছাত্রী। এই সহিংসতা থামানো না গেলে রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সব নারীকে সরিয়ে দেওয়ার একটি ভয়ংকর প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা কারোরই কাম্য নয়। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হচ্ছে।’

তিনি জানান, গত রবিবার দুপুরে যশোর-২ আসনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোটের প্রচারণাকালে জামায়াতের নারী নেত্রীদের ওপর যুবদলের হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটে। এতে দুজন নারী আহত হন। ঝিকরগাছা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কীর্তিপুর এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা মহিলা নেত্রীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট চাইতে গেলে উপজেলা যুবদলের সভাপতি আরাফাত রহমান কল্লোলের নেতৃত্বে সবুজ, আহনাত, সোহাগসহ ১৫-২০ জনের একটি দল জামায়াতের মহিলা কর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা করে আহত করে এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ভাঙচুর করে। ওই সময় তারা ভ্যানিটি ব্যাগও ছিনিয়ে নেয়।

একই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চুয়াডাঙ্গায় জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেলের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গসংগঠনের নারী নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছিলেন। এ সময় এলাকার বিএনপির কয়েকজন নারী কর্মী প্রথমে তাদের বাধা দেন এবং হেনস্তা করেন। পরে বিএনপির পুরুষ কর্মীরাও ঘটনাস্থলে এসে জামায়াতের নারী কর্মীদের গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় দাওয়াতি কার্যক্রমে অংশ নেওয়া নারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও মারধরের অভিযোগ করেছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ ঘটনায় জামায়াতের পাঁচজন নারী আহত হন।

কুমিল্লায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় জামায়াতের নারী কর্মীদের প্রকাশ্যে ঘিরে ধরে হেনস্তা করা হয়। নারীদের হিজাব-নেকাব খুলে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, নারীদের কথা বলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে, চলাফেরায় বিঘœ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের গোপালপুরে বিএনপি কর্মীদের দ্বারা জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। নারীদের প্রচারণা কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হয়, ধাক্কা দেওয়া হয়, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। লালমনিরহাটে জামায়াতের নারী কর্মীদের হিজাব নিয়ে টানাহেঁচড়া করে এবং হিজাব খুলে নেন বিএনপি কর্মীরা। তারা বলেন, ভোট চাইতে নয় বরং চুরির জন্য এসেছেন নাকি জামায়াত কর্মীরা। ঘটনার ভিডিও ধারণ করলে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। জামায়াতের পুরুষ সদস্যদের বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে রুমে ঢুকিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয়। চারটি মোটরসাইকেল ও একটি ল্যাপটপ ভাঙচুর করা হয়। প্রশাসনের সামনে এ ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।

ভোলায় লালমোহনের রামগঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াতের নারী কর্মীরা গণভোট ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে ইউনুছ পাটওয়ারীর বাড়িতে যান। এ সময় স্থানীয় নুরনবীর ছেলে রুবেল (২৮) তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ ও গালাগাল করেন। বিষয়টি জানতে পেরে এক নারী কর্মীর স্বামী ও রায়চাঁদ বাজারের ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন মোবাইল ফোনে রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকেও গালাগাল করা হয়। পরে রুবেল জসিম উদ্দিনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তার ওপর হামলা চালান। সন্ধ্যার দিকে বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বাজার এলাকায় জড়ো হন। একপর্যায়ে ১০ দলীয় জোটের কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে বিডিপির (বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি) অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়ে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন।

অন্যদিকে ভোলার চরফ্যাশনে পছন্দের প্রার্থীর বিপক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নামায় হাজেরা বেগম নামে এক নারীকে মারধর করে গুরুতর আহত করেন স্থানীয় এক যুবদল নেতা শাহাবুদ্দিন। এ সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে ওই নারীর ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকেও নির্মমভাবে মারধর ও পেটে লাথি মারা হয়। একপর্যায়ে শাহাবুদ্দিন ওই নারীর কান ছিঁড়ে স্বর্ণালংকার নিয়ে যান এবং কাঠ দিয়ে মাথায় আঘাত করলে তিনি ঘটনাস্থলেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে চিকিৎসক তার মাথায় ছয়টি সেলাই এবং ছিঁড়ে যাওয়া কানে দুটি সেলাই দেন।

জামায়াত নারীরা যাতে নির্বাচনী কাজ না করতে পারেন, সেজন্য হুমকি দিয়েছেন বিএনপি নেত্রী ও বিএনপি এমপি প্রার্থীর স্ত্রী এবং বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া। পাপিয়া তার বক্তব্যে বলেন, ‘মা-বোনদের উদ্দেশে বলছি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রীসংস্থার কর্মীরা কেউ বাসায় গেলে ৯৯৯-এ কল দিয়ে ধরিয়ে দেবেন, যাতে বয়ান দেওয়ার আর সুযোগ না পান।’

মেহেরপুরের গহরপুর গ্রামে জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্তার প্রতিবাদ করায় তিনজনকে মারধর করা হয়। ভোট চাইতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতা আলেহিম ও হায়দারের নেতৃত্বে এই হামলা ও মারধর করা হয়। এর আগেও একবার তারা নির্বাচনী কাজে বাধা দিয়েছিল।

কেরানীগঞ্জে বিএনপি কর্মীদের হাতে জামায়াতের নারী কর্মীরা মারধরের শিকার হন। জামায়াতের এমপি প্রার্থীর পক্ষে নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বাচনী প্রচারপত্র বিলি করছিলেন। তখন আরেক নারী কর্মী মোবাইল ফোনে দৃশ্য ধারণ করছিলেন। ঠিক সে সময় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ভিডিও ধারণকারীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তখন অন্য নারী কর্মীরা বাধা দিলে তাদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও ওড়না টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়। একপর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা জামায়াতের নারী কর্মীদের লাথি ও কিলঘুসি দেন। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সংঘর্ষে নারী কর্মীরা আহত হয়েছেন, বাধার মুখে পড়েছেন, কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত