আল জাজিরাকে জামায়াত আমির

‘নারীরা কখনো জামায়াতের প্রধান হতে পারবেন না’

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম

সম্প্রতি কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, দলের প্রধান (আমির) পদে কোনো নারী কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এটা আল্লাহপ্রদত্ত সৃষ্টিগত পার্থক্যের কারণে সম্ভব নয়। এসময় তিনি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থী না দেওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করেন।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। এতে জামায়াতের উত্থান, ইসলামী আইন প্রয়োগ, নারী অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, ১৯৭১-এর ভূমিকা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। 

শ্রীনিবাসন বলেন, আপনি জনগণের ইচ্ছার কথা বললেন। তবে গত বছরের জুলাই মাসে আপনার দলের নায়েবে আমীর মুজিবুর রহমান এক জনসমাবেশে বলেছেন, আগামী সংসদ কেবলমাত্র ইসলামী আইনের ভিত্তিতেই চলবে। এখানে মানবরচিত কোনো মতবাদের স্থান নেই। জবাবে জামায়েতের আমীর বলেন, এ ক্ষেত্রে দলের প্রধানের বক্তব্য অনুসরণ করা উচিত।

আপনি বলছেন দলের প্রধানের বক্তব্যই অনুসরণ করবেন। তাহলে কি আপনি তার কথাকে প্রত্যাখ্যান করছেন?

শফিকুর রহমান বলেন, না, না। আমি কিছুই প্রত্যাখ্যান করছি না বা গ্রহণ করছি না। তবে যখন দলের কৌশল বিবেচনা করা হবে, তখন দলের প্রধান যা বলবেন সেটাই দেখা হবে। ইসলাম যে মূল্যবোধগুলো স্বীকৃতি দেয়, আমরা তা প্রচার করছি; যেমন—দুর্নীতি বিরোধিতা, সর্বত্র স্বচ্ছতা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার রক্ষা।

এসময় শ্রীনিবাসন প্রশ্ন করেন, যদি ক্ষমতায় আসেন, তাহলে কি ইসলামী আইন চালু করবেন? শফিকুর রহমান বলেন,  যদি দেশের উন্নতির জন্য তা অপরিহার্য হয়, তাহলে সংসদ বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেবে। আমি নই। সংসদই সিদ্ধান্ত নেবে। আপনার অবশ্যই দলের প্রধানের বক্তব্য অনুসরণ করা উচিত। আমরা ইসলামের বিষয়গুলোই তুলে ধরছি। যেমন- দুর্নীতি দমন, সকল স্থানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জনগণের গণতান্ত্রিক মানবাধিকার। যদি এই আইন দেশের জন্য ভালো হয় তাহলে সেটা সংসদ সিদ্ধান্ত নেবে। 

পরে নারীর কর্মঘণ্টা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একজন সন্তান লালন পালন করেন, একইসঙ্গে তিনি তার কর্মসংস্থানে একজন পুরুষের মতো একই সময় কাজ করেন। আমি মনে করি এটা ন্যায়বিচার নয়। এই সময়টাতে একজন নারীকে সম্মান দেখানো উচিত। এক্ষেত্রে নারীদের এই সুযোগের অভাবে কাজ ছেড়ে দিতে হয়। এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা বলেছি, যদি কেউ মনে করে তাহলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। তবে কোনো নারী যদি পুরো আট ঘণ্টাই কাজ করতে চায় তাহলে সে করতে পারবে।

এসময় শ্রীনিবাসন জানান, ইতোমধ্যেই মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ আছে, যা অনেক নারী গ্রহণ করেন। শফিকুর রহমান তার জবাবে বলেন, শুধু ছয় মাসের জন্য।  আমরা মনে করি এটা যথেষ্ট নয়। একটি শিশু ছয় মাসে বড় হয়ে ওঠে না।

বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে লাখো নারী কাজ করেন উল্লেখ করে শ্রীনিবাসন বলেন, বাংলাদেশের কর্মজীবী ৫০ শতাংশেরও বেশি নারী পোশাকশিল্পের সঙ্গে জড়িত। । তারা সেখানে পৌঁছাতে দশকের পর দশক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তারা সেই ধারণার বিরুদ্ধে লড়েছে যে নারীদের শুধু মা হতে হবে এবং সন্তান দেখাশোনা করতে হবে। পুরুষরাও সেই দায়িত্ব নিতে পারে। আর আশঙ্কা হলো আপনার প্রস্তাব সময়কে পিছিয়ে দিচ্ছে, ফলে নিয়োগকর্তারা নারীদের নিয়োগ দিতে চাইবে না কারণ তাদের কর্মঘণ্টায় সীমাবদ্ধতা থাকবে।

শফিকুর রহমান এর জবাবে বরেন, এটা আপনার উদ্বেগ, কিন্তু বাস্তবতা নয়। আমি আমার বক্তব্যের পর কয়েকটি পোশাকশিল্প পরিদর্শন করেছি। আমি কোথাও এমন কিছু দেখিনি। বরং তারা স্বস্তি অনুভব করেছে। হ্যাঁ, তারা বলেছে দুই বা আড়াই বছর পর আবার কাজে ফিরে আসার সুযোগ পাবে। কিন্তু যখন তারা চাকরি ছেড়ে দেয়, তখন আর ফিরে আসে না।

শ্রীনিবাসন জৈন জানতে চান- আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের নারী প্রার্থীর সংখ্যা কতো? জবাবে ডা. শফিক বলেন, না একজনও না। অন্য দলও যে খুব বেশি দিয়েছে সেটা আপনি দেখাতে পারবেন না। কারণ এটা বাংলাদেশের কালচার। আমরা এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আল জাজিরার সাংবাদিক পাল্টা প্রশ্ন করেন- কিন্তু তারা অল্প কিছু হলেও দিয়েছে। আপনাদের মতো শূন্য না। আপনারা একজনকেও দিলেন না কেন? জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি এরইমধ্যে উত্তর দিয়েছি। আমরা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এটা একদিনে হয়ে যাবে না। আমরা এ বিষয়ে নারীকে অসম্মান করি না। 

যদি কখনো কোনো নারী চান যে তিনি জামায়াতের প্রধান হবেন, সেটা কি সম্ভব? আলজাজিরা সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিক বলেন, এটা সম্ভব নয়। সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহ প্রত্যেককে তাদের নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। আপনি কখনও সন্তান জন্ম দিতে পারবেন না। আমরা কখনও সন্তানকে স্তন্যপান করাতে পারব না। এটা আল্লাহ প্রদত্ত। আর পুরুষ ও নারীর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।

সব নারী মা হতে চান বা হবেন এমন নয়। কিন্তু হলেও, সন্তান লালন-পালন করলেও, কেন তারা জামায়াতের মতো একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে পারবেন না? এ প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, এমন কিছু জিনিস আছে যেখানে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আপনি জানেন সেটা। শ্রীনিবাসন জৈন বলেন- না, আমি আসলে জানি না। জামায়াতের আমীর বলেন, কেন জানেন না সেটা আপনি? মা বাচ্চা পয়দা করার পর যে দায়িত্ব পালন করে, সেটা কি আপনি পারবেন? কখনোই না। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন। 

আল জাজিরার পাল্টা প্রশ্ন- কিন্তু গত তিন দশক তো দেশে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তারা কি দেশ চালাননি? ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা তাদেরকে অসম্মান করছি না। আমাদের তাতে অসুবিধা নাই। 

মেয়েরা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে না? তারা কতো প্রতিষ্ঠানের প্রধান না? তাহলে দেশ চালাতে পারবে না কেন? এসব প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ নারীদেরকে এ পদে যোগ্য মনে করে না। শারীরিকভাবেই এটা সম্ভব না। এটাই সত্য। 

আল জাজিরার সাংবাদিক প্রশ্ন করেন- আপনি বিএনপি’র (জোটের) অংশ ছিলেন আগে, যেখানে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আপনি কি মনে করেন না যে, উনি ভালো কাজ করেছেন? এটা বেশ বিস্ময়কর যে আপনি এমন দেশে এটা বলছেন যেখানে গত তিন দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিনি। আমি আগেই বলেছি আমরা অসম্মানজনক নই। হ্যাঁ। কিন্তু যদি আপনি বিশ্বে তাকান, উন্নত দেশগুলোতে কতজন নারী সামনে এসেছে?

এসময় আলজাজিরার সাংবাদিক জানান, অনেক দেশে নারী নেতা ছিলেন, আপনার দেশসহ। শফিকুর রহমান বলেন, তবে অল্প কয়েকটি দেশে।

পরে ডা. শফিকুরের সঙ্গে আলজাজিরার এই সাংবাদিকের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধ প্রসঙ্গ, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, তরুণদের প্রত্যাশা ও জামায়াতের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গেও অনেক আলোচনা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত