অসুস্থতায় ধৈর্য ধারণের ফজিলত

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৮ এএম

সুস্থতার স্বাভাবিক ছন্দ থেমে গেলে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা টের পায়। বুঝতে পারে, শক্তি ও সক্ষমতার সবটুকু তার হাতে নয়। এই উপলব্ধিই তাকে আল্লাহর দিকে আরও গভীরভাবে ফিরিয়ে আনে। ইসলামের দৃষ্টিতে রোগ-ব্যাধি শুধু কষ্টের নাম নয়, এটি মুমিনের জন্য এক বিশেষ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ভেতর দিয়ে বান্দার ধৈর্য ও আল্লাহমুখিতা যাচাই হয়। অসুস্থতার দিনগুলোতে যে ব্যক্তি সন্তুষ্টির সঙ্গে আল্লাহর হুকুম মেনে নেয়, তার জন্য রয়েছে বড় পুরস্কার। রোগের প্রতিটি যন্ত্রণা মুমিনের জন্য হয়ে ওঠে গুনাহ মাফের উপলক্ষ।

হজরত আমের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এক দিন সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, যদি কোনো মুমিনের রোগ হয়, অতঃপর আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেন, তবে এটি তার জন্য পূর্ববর্তী গুনাহের কাফফারা হয়। (আবু দাউদ) অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ওই মুমিনের ওপর আমি আশ্চর্য হই, যে রোগের প্রতি বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ হয়। সে যদি জানত রোগের মধ্যে কী রয়েছে তবে সে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরো জীবনটাই রোগাক্রান্ত থাকাটা নিজের জন্য আবশ্যক করে নিত। (মুসনাদে বাজজার)

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে কষ্টে ফেলেন। (মুয়াত্তা মালেক) এ কল্যাণ বিভিন্নভাবে হতে পারে। আতা ইবনে ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন কোনো মানুষ রোগে আক্রান্ত হয় তখন আল্লাহতায়ালা তার কাছে এ নির্দেশ সহকারে দুজন ফেরেশতা পাঠান যে, দেখো সে তার সেবাকারীর কাছে কী বলছে? যদি ওই ব্যক্তি অসুস্থ হওয়ার পরও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে থাকে তবে সে খবর ফেরেশতাদ্বয় আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়। তখন আল্লাহ বলেন, আমি যদি তাকে মৃত্যু দিই তবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাব, আর যদি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দিই তবে তার গুনাহ ক্ষমা করে দেব। (মুয়াত্তা মালেক) অতএব বোঝা গেল, রোগ মানুষের জন্য কল্যাণ নিয়ে আসে, চাই তা দুনিয়ার কল্যাণ হোক বা পরকালের কল্যাণ। এ সম্পর্কে আল্লাহর চিরন্তন নীতি হলো, ‘নিশ্চয় কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে, নিশ্চয় কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে।’ (সুরা ইনশিরাহ ৫-৬)

মুমিন ব্যক্তি কোনো রোগে আক্রান্ত হলে রোগাক্রান্ত হওয়ার কষ্টটা তার পূর্বের গুনাহের জন্য কাফফারা হয়ে যায়। অর্থাৎ রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে মুমিনের পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ হয়। এ সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, মুসলিম ব্যক্তি কোনো দুঃখ-কষ্ট, ক্লান্তি, রোগ, চিন্তা বা ক্ষুদ্রতর ব্যথা অনুভব করলে সেটার মাধ্যমে তার পাপ দূর হয়। (সহিহ বুখারি) আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিনের গায়ে কাঁটা বিঁধলেও সেটার অসিলায় তার গুনাহ মাফ করা হয়। (মুয়াত্তা মালেক)

রোগের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ না হয়ে যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ তাকে উত্তম পুরস্কার দান করেন। একাধিক হাদিসে রাসুল (সা.) রোগকে জান্নাত লাভের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আতা ইবনে আবি রাবাহ (রা.) বলেন, একবার আমাকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, আমি কি আপনাকে এক জান্নাতি মহিলাকে দেখাব? আমি বললাম অবশ্যই। তিনি বললেন, ওই কালো মহিলাকে দেখুন। ওই মহিলা একদিন রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার মৃগী রোগের চাপ শুরু হলে কোনো কোনো সময় আমার সতর খুলে যায়। তাই আমার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে ধৈর্যধারণ করতে পারো। তাহলে জান্নাত লাভ করতে পারবে। আর যদি চাও তবে আমি তোমার রোগমুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করব। তখন মহিলাটি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধৈর্যধারণ করব। তবে আমার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন যেন আমার সতর খুলে না যায়। তখন রাসুল (সা.) তার জন্য সেই দোয়া করলেন। (সহিহ বুখারি)

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত