ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত বাণিজ্য চুক্তি খবরে প্রতিযোগী দেশের মধ্যে অসম বাণিজ্যের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মার্কিন শুল্ক পার্থক্য উল্লেখযোগ্য না হলে রপ্তানি খাত বহুমুখী চাপে পড়বে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ৯ ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া চুক্তিতে সরকারকে বিশেষ সফলতার প্রমাণ রাখতে হবে বলে মনে করছেন তারা।
জানা যায়, প্রায় দুই দশক ধরে চলমান আলোচনার অবসান ঘটিয়ে ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য চুক্তি করতে যাচ্ছে। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে মার্কিন-ভারত চুক্তির ঘোষণাটিও এলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ১৮ শতাংশে নেমে আসবে। আর ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কার্যকর হলে ভারতে রপ্তানি করা ইইউর প্রায় ৯৬ শতাংশ পণ্যে শুল্ক উঠে যাবে। অন্যদিকে ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে ইইউ। এতে অঞ্চলটিতে ভারতীয় পণ্যের প্রভাব আরও বাড়বে।
অন্যদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি শুল্ক চুক্তি করতে যাচ্ছে। এর আগে দর কষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়েছে। এটি বর্তমান সরকারের বড় সফলতা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এখন ধারণা করা হচ্ছে, ৯ ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া চুক্তিতে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক আরও কমে ১৫ শতাংশে আসতে পারে। তবে ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর মার্কিন শুল্ক হার কমলেও সেটি হতে হবে প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার ৯ তারিখ চুক্তি করবে। তখন শুল্ক কমিয়ে দেশে এসে বলবে আমরা জয় করে এসেছি। কিন্তু কথা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশ ইউরোপ ও আমেরিকার সঙ্গে যে চুক্তি করবে, সে হিসেবে আমাদের সুবিধা বা অসুবিধা কতটুকু সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের কথা হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের শুল্ক পার্থক্য অন্তত ৭ থেকে ১০ শতাংশ হতে হবে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারব না। কারণ ভারতের শিল্প সুরক্ষায় যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, সেখানে আমরা ধারে-কাছেও নেই। তাদের বন্দর ব্যবস্থাপনা অনেক আধুনিক। পণ্য রপ্তানিতে আমাদের তুলনায় তাদের সময় কম লাগে। এ ছাড়া ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প অনেক শক্তিশালী। ফলে ভারতের তুলনায় শুল্ক দুই শতাংশ কমিয়ে চুক্তি করাকে সফলতা বলা যাবে না। প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে পার্থক্য উল্লেখযোগ্য হতে হবে। সেজন্য আমাদের চুক্তিটি হতে হবে, সময় উপযোগী ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে পারি। আর যদি সরকার এতে ব্যর্থ হয়, তবে আমাদের বাজার হারাতে হবে। তখন অন্যরা বাজার দখল করবে। আশা করছি সরকার রপ্তানি খাত সুরক্ষায় মার্কিন চুক্তি স্বাক্ষর করবে, যা ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করবে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, চুক্তির খসড়া নিয়ে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা দরকার। কারণ, চুক্তির তিন দিনের মাথায় দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বর্তমান সরকার যে চুক্তি করবে তা বাস্তবায়নের দায় নতুন সরকারের ওপর পড়বে। সেখানে চুক্তির কারণে কার কী উপকার বা ক্ষতি সে বিষয়ে কোনো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের অন্ধকারে রাখছে। নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছে।
