তারেক রহমানকে ‘সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী’ আখ্যা

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৪ এএম

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন এমন পূর্বাভাস দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গণমাধ্যম ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’। “অ্যান ইন্টারভিউ উইথ তারেক রহমান লাইকলি বাংলাদেশ’স নেক্সট প্রাইম মিনিস্টার” শীর্ষক আর্টিক্যালে নির্বাচনের আগে পরিচালিত একাধিক জনমত জরিপের তথ্য উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমটি এই পূর্বাভাস দিয়েছে।

নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে ব্লুমবার্গ, টাইম ও দ্য ইকোনমিস্টসহ বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলো তারেক রহমানকে শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করার পর দ্য ডিপ্লোম্যাট এবার তাকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী আখ্যায়িত করল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিসেম্বরে পরিচালিত একটি জনমত জরিপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতি সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ, আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভেশন কনসালটিং পরিচালিত আরেকটি জরিপে দেখা যায়, ৪৭ শতাংশের বেশি মানুষ এখন তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন, ২২ দশমিক ৫ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রধান ডা. শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে প্রত্যাশা করছেন।

দ্য ডিপ্লোম্যাট পর্যবেক্ষণে বলেছে, ‘জেন জেড’ হিসেবে পরিচিত তরুণ ভোটাররা ভোটের ক্ষেত্রে বড় সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা রাখবে। এবারের নির্বাচনে ভোটারদের একটি বড় অংশ জেন জেড। বাংলাদেশের তরুণরাই এবার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করবে।

এতে আরও বলা হয়, জেন জেড-এর অনেক ভোটার বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে, বিশেষ করে যেগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সম্প্রতি দ্য ডিপ্লোম্যাটকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তারেক রহমান। তখন তিনি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিরাজগঞ্জে একটি নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর টাঙ্গাইলে আরেকটি নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দিতে বাসে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাব দেন।

জেন জেড সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, তারা জেন জেডের চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা, আইটি খাত এবং শ্রমবাজারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমি মনে করি, এগুলো জেন জেডের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। আজকের পরিবেশ দেখলে লক্ষ্য করবেন, সভায় উপস্থিত অধিকাংশ মানুষই জেন জেড-এর।

তারেক রহমান বলেন, ‘দ্য প্ল্যান’ নামের একটি কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি তাদের কথা শোনেন, যেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা তাদের চিন্তা, উদ্বেগ ও ধারণা তুলে ধরেন এবং আমি সত্যিই তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উপভোগ করি।

দ্য ডিপ্লোম্যাট উল্লেখ করেছে যে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা ছিল, যখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের নজর ছিল বাংলাদেশের দিকে।

এ বিষয়ে দ্য ডিপ্লোম্যাট তারেক রহমানের কাছে তার পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি। আমরা অর্থনীতিনির্ভর পররাষ্ট্রনীতিকে অগ্রাধিকার দেব, যা বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত করবে। আমরা পারস্পরিক আস্থা, পারস্পরিক সম্মান ও পারস্পরিক লাভে বিশ্বাস করি।

তিনি আরও বলেন, আমরা যে দেশগুলোর সঙ্গেই সম্পৃক্ত হই না কেন, আমাদের জাতীয় স্বার্থ সবার আগে।

জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং রাজনীতিতে পারস্পরিক সম্মান করবে এবং আমরা আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখব এবং সবার জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করব।

ভোট প্রসঙ্গে দ্য ডিপ্লোম্যাট তারেক রহমানকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জেন জেডের একটি অংশ বিশেষভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর প্রতি ঝুঁকছে, যারা তার বিরোধিতা করবে এবং আগামী দিনে সংসদ ও রাজপথে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাবে।

শত্রুভাবাপন্ন জেন জেডকে নিয়ে কতটা চ্যালেঞ্জ অনুভব করছেন, এ প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, আমি চ্যালেঞ্জ অনুভব করি না। আমরা একটি রাজনৈতিক দল। আমরা আমাদের পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছি, অন্যরাও একই কাজ করছে। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কোন পরিকল্পনা তাদের জন্য ভালো।

তিনি যোগ করেন, বিএনপি জেন জেডের চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা, আইটি খাত ও শ্রমবাজারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমি মনে করি, জেন জেডের সঙ্গে এগুলো দৃঢ়ভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের অঙ্গীকারকে অবাস্তব বা ‘পাইপ ড্রিম’ কি না এ প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান বলেন, ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়া কঠিন, তবে অসম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, ২০ কোটি মানুষের মধ্যে ৫ কোটির কর্মসংস্থান প্রয়োজন এবং আমাদের আইনশৃঙ্খলা ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সারা দেশে ব্যবসা বিকাশে সহায়তা করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়; যা বিএনপি সরকারের সময় চালু হয়েছিল।

তিনি বলেন, আমরা এখন আইটি খাতে জোর দেব। একই সঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জুতাশিল্প ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতেও মনোযোগ দেব।

তারেক রহমান বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসহ খাদ্য খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে এবং আমরা পর্যাপ্ত মাছ ও সবজি উৎপাদন করে তা বিদেশে রপ্তানি করতে পারি। আমরা সৃজনশীল অর্থনীতিতেও সুযোগ খুঁজছি।

ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি শক্তিশালী আর্থিক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তবে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। আমাদের অঙ্গীকার হলো একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিচারের আওতায় আনা হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার দল আইনশৃঙ্খলাকে এমন অবস্থানে নিতে চায়, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা বিঘিœত হবে না এবং মানুষ রাতে ভয় ছাড়াই ঘরে ফিরতে পারবে (এবং) অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তার অঙ্গীকার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমরা শুরু করব। কারণ, আমাদের শুরু করতেই হবে এবং আমরা দায়িত্বশীলভাবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করব ও গ্লোবাল ক্লাইমেট ফান্ড থেকে অর্থ সংগ্রহ করব।

তিনি আরও বলেন, বিএনপি ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোকে অগ্রাধিকার দেবে।

তিনি আরও বলেন, বাস্তবতা কঠিন। অতীতে মাত্র ২০ ফুট খনন করলেই ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যেত। কিন্তু আজ ৩০০ ফুট খনন করেও অনেক সময় পানি পাওয়া যায় না।

নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, আমরা আমাদের ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করব। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা এসব মূল অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছি এবং এসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেব।

তিনি পরিশেষে বলেন, আমরা জনগণের স্বার্থ ও আকাক্সক্ষা পূরণের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনব। আমরা জনগণের আকাক্সক্ষাকে সমুন্নত রাখব। আমরা জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করব, এটাই দেশের মানুষের প্রতি আমার অঙ্গীকার।

বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এটি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এ কারণেই এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের আগস্টে ১৬ বছর ধরে চলা কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। সেই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন পটভূমি ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার শাসনের অবসান ঘটে এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যাপারে নতুন আশা তৈরি হয়।

এবারের নির্বাচনে ভোটারদের একটি বড় অংশ জেনারেশন জেড বা জেন-জি এবং মিলেনিয়াল। এক অর্থে বলা যায়, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মই ঠিক করবে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। এই জেন-জি ভোটারদের অনেকেই বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। বিশেষ করে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আয়োজিত কর্মসূচিগুলোয় তরুণদের উপস্থিতি লক্ষণীয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত