৯ উপদেষ্টার আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩২ এএম

দুদিনের জন্য স্থগিত হলো চট্টগ্রাম বন্দরের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কর্মসূচি। আর এতে গত ছয় দিন ধরে যে অচলাবস্থার তৈরি হয়েছিল, এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেল। মূলত আসন্ন রমজানের ভোগ্যপণ্য খালাসে জটিলতা তৈরি হওয়ায় দেশের ১৮ কোটি মানুষ ভোগান্তিতে পড়তে যাচ্ছিল। এ অবস্থা থেকে কিছুটা মুক্তি দিতে নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের আশ্বাসে শুক্র ও শনিবারের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে মিটিংয়ের পর নৌ উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন সংবাদকর্মীদের ব্রিফিংয়ে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে জিম্মি করে দেশের ১৮ কোটি মানুষকে বিপদে ফেলা অন্যায়। এটা করতে দেওয়া যেতে পারে না। আগামীকাল (আজ) শুক্রবার থেকে বন্দর যেভাবেই হোক সচল হবে। এতে যদি কেউ বাধা দিতে আসে সরকার হার্ডলাইনে এসে তা মোকাবিলা করবে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রশ্নে উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চুক্তি তো হবেই, এটা ঠেকানো যাবে না। এখনো দরকষাকষি চলছে। জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো চুক্তি হবে না। চুক্তিতে অবশ্যই জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করা হবে।

শ্রমিক নেতারা উপদেষ্টার কাছে কী দাবি উত্থাপন করেছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে তাদের আপত্তি। তবে আমি জানিয়েছি এটি আমার একার বিষয় নয়। এর জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। আমি আজকের এ পরিস্থিতি কমিটির কাছে উপস্থাপন করব এবং প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করব। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে সরকারের পক্ষ থেকে। এখানে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া তারা আরও একটি দাবি জানিয়েছেন, তা হলো যেসব শ্রমিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য। আমি তাদের সব দাবি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছি।

গত ছয় দিনের কর্মসূচির কারণে দেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, এ ক্ষতির দায়ভার কে বহন করবে? এ বিষয়টিও উঠে আসা প্রয়োজন। তবে আমরা এখনো ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করিনি।

এদিকে উপদেষ্টার ব্রিফিংয়ের পর আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতারা সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় আন্দোলনকারীদের নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, আমরা চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি টার্মিনালকে বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া যাবে না বলে জানিয়েছি। জবাবে উপদেষ্টা বলেছেন, এ বিষয়টি এখানে আমি কথা দিতে পারব না। ঢাকায় গিয়ে আমার ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ছাড়া যেসব নেতাকর্মীকে বদলি করা হয়েছে, তাদের স্বপদে বহাল রাখার পাশাপাশি আগামীতেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না বলে দাবি জানিয়েছি।

কিন্তু উপদেষ্টা বলেছেন আজ থেকে বন্দর যেভাবেই হোক সচল রাখার বিষয়টি? এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া অন্য নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, উপদেষ্টা যেহেতু আমাদের সঙ্গে বৈঠকে দাবি নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন, তাই উনি যাতে ঢাকায় গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, সেজন্য আমরা দুদিনের সময় দিচ্ছি। শুক্র ও শনিবারের জন্য আমরা আমাদের কর্মসূচি স্থগিত করলাম। যদি এ দুদিনের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের দাবির বিষয়ে পজিটিভ কোনো ফলাফল না দেয়, তাহলে রবিবার থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি চলমান থাকবে। আমরা রমজানের ভোগ্যপণ্যের বিষয় ও উপদেষ্টার আশ্বাসের কথা বিবেচনা করে কর্মসূচি কিছুটা শিথিল করলাম।

বন্দর পরিচালনায় সরকারের হার্ডলাইন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, হার্ডলাইন আমাদের বলে লাভ নেই। এই কয়দিনের আন্দোলন কর্মসূচিতে আমরা তা প্রমাণ করেছি। আমরা কোনোভাবেই এনসিটি কনটেইনার টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর চাই না। আর আমরা তা হতে দেব না।

ব্যবসায়িক চরম ক্ষতি : বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সরওয়ার হোসেন সাগর বলেন, এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টি অপূরণীয়। আর এ কদিনের সংকটের প্রভাব দেশের ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়বে এবং মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। অন্য এক আমদানিকারক ফ্রেন্ডস গ্রুপ অব কোম্পানিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমানুল্লাহ আল সগির বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে কোনোদিন জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়নি। এবারের আন্দোলনে আমরা জাহাজ বন্ধ থাকার কর্মসূচিও দেখলাম। এতে কোনো পণ্য জাহাজ থেকে যেমন নামতে পারেনি তেমনিভাবে জাহাজে উঠতেও পারেনি। ফলে উভয় দিকে ক্ষতি বেড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় আমরা প্রতিদিন প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। সামনে রোজা। শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস দিতে হবে। এই অবস্থায় কাজ না হলে আয় আসবে কোথা থেকে?

এর আগে সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রহরায় নৌ উপদেষ্টা চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের সময় আন্দোলনকারী শ্রমিক কর্মচারীরা ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড গো ব্যাক ব্যাক’, প্রশাসনের দালালরা হুঁশিয়ার সাবধান, বলে সেøাগান দিতে থাকেন। শ্রমিক কর্মচারীদের বিক্ষোভের মধ্যেই বন্দর ভবনে সকাল থেকে তিন দফা মিটিং করেন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এনসিটিকে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালনার দায়িত্ব দিতে কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে উভয়পক্ষের মধ্যে দরকষাকষি চলছে। কিন্তু শ্রমিক-কর্মচারীরা এ চুক্তির বিপক্ষে। তাদের যুক্তি একটি রেডিমেড টার্মিনালকে আমরা কেন বিদেশিদের হাতে তুলে দেব? এর আগে বে টার্মিনালের দুটি টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল বিদেশিদের দেওয়ার বিষয়ে সরকারের চুক্তি হলেও আমরা আন্দোলন করিনি। এই রেডিমেড টার্মিনাল কোনো বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া যাবে না। এটা নিয়ে গত শনি থেকে সোমবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল ও প্রশাসনিক কাজে। মঙ্গলবার ছিল ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি এবং বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দেয় শ্রমিকরা। আর এর মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার আলোচনার জন্য নৌ উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে আসেন। এদিকে এ আন্দোলন কর্মসূচি চালানোর অভিযোগে আন্দোলনকারী ১৬ জনকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তারপরও আন্দোলন কর্মসূচি বন্ধ হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ে ১০ সংগঠনের বিবৃতি : চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি ও জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সৃষ্ট মহাবিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করে দেশের শীর্ষ ১০ বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। গতকাল রাজধানীর গুলশানে বিটিএমএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠক শেষে বিবৃতিতে তারা সমস্যার সমাধানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিটিটিএলএমইএ, বিজিএপিএমইএ এবং বিজিবিএ’র সভাপতিরা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি একটি বিরল সংকট, যা জাতীয় অর্থনীতির হৃৎপি- হিসেবে বিবেচিত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়া হচ্ছে। বন্দর এক দিন বন্ধ থাকা মানেই অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাকসহ সব খাতের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় দেশ এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

তারা বলেন, একদিকে রপ্তানি খাতের কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে পারছে না, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় বন্দরে পড়ে আছে। এতে করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে দেওয়া ‘ডেডলাইন’ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আমরা আশঙ্কা করছি, এ অবস্থা আর মাত্র কয়েক দিন স্থায়ী হলে বড় ধরনের ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে এবং বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে তাদের সোর্সিং সরিয়ে নেওয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের চাহিদা হ্রাস, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিল্পগুলো বিপর্যয়ের সম্মুখীন- উদ্যোক্তারা প্রাণান্তকর সংগ্রাম করছেন ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে। এরই মধ্যে বন্দর অচলাবস্থার কারণে ভয়াবহ কনটেইনার জট সৃষ্টি হওয়ায় ডেমারেজ চার্জ, পোর্ট চার্জ ও স্টোরেজ রেন্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে করে রপ্তানির জন্য পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব রাখবে।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত ব্যয় আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের ওপরই পড়বে। সামনেই পবিত্র রমজান মাস। এখনই এ সংকট নিরসন না হলে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হবে, যার ফলে কৃত্রিম সংকটে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। এ জনভোগান্তির দায়ভার আমাদের সবাইকে বহন করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত