অতীতের সংসদ নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর আসনগুলোতে বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াতের ত্রিমুখী লড়াই হলেও সবসময় ফলাফল ভালো করেছে বিএনপি। অন্যদিকে এসব আসনে জামায়াতের ভোটের ফলাফল খুব একটা সুখকর ছিল না। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় মহানগরীর তিনটি আসনেই ভোটের গতানুগতিক হিসাব মিলবে না বলে মনে হচ্ছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান অক্ষুণœ রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন, অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থীরাও মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন বিএনপির দুর্গ ভাঙতে।
চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে মহানগরীতে রয়েছে তিনটি। নানা কারণে এ তিনটি আসনকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে মন্ত্রীর আসন হিসেবেখ্যাত কোতোয়ালি আসন রয়েছে, তেমনি বন্দর, কাস্টমস, বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনার কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পতেঙ্গা-বন্দর আসনও রয়েছে। আবার একসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্বাচনী আসন হিসেবে পরিচিত ডবলমুরিং-হালিশহর আসনটিকেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। এ তিনটি আসনেই এবারের নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা।
বিএনপি নেতারা মনে করেন, দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলটি জনগণের আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি সাধারণ মানুষের অন্যরকম আবেগ ও ভালোবাসা রয়েছে। তাছাড়া নগরীর তিনটি আসনে বিএনপি যাদের প্রার্থী করেছে, তারা প্রত্যেকেই নগরবাসীর কাছে রাজপথের পরিচিত মুখ। সেদিক থেকে দলীয় গণ্ডির বাইরেও সাধারণ ভোটাররা বিএনপির পক্ষেই রায় দেবেন।
অন্যদিকে জামায়াত নেতাদের মতে, রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ফ্যাসিবাদী আচরণ সম্পর্কে দেশের মানুষ এখন ভালোভাবে অবগত। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে মানুষ আগামীতে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র দেখতে চায়। তাছাড়া এখানে জামায়াতের প্রার্থীরা প্রত্যেকেই পরিচ্ছন্ন ইমেজের অধিকারী। দলের মধ্যে প্রার্থিতা নিয়ে কোনো কোন্দল নেই। তাই সচেতন ভোটাররা তাদের পক্ষে রায় দেবেন।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) : মন্ত্রীর আসন হিসেবেখ্যাত চট্টগ্রাম-৯ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়েছে আবু সুফিয়ানকে। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। এই আসন থেকে ১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন অধ্যাপক আরিফ মঈনুদ্দিন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে আবদুল্লাহ আল নোমান এ আসন থেকে নির্বাচিত হন। তারা দুজনই পরবর্তীকালে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য শামসুল আলম, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদুল আলম রাসেলসহ অনেকেই দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু এখন তারা সবাই আবু সুফিয়ানের পক্ষে ভোটের মাঠে রয়েছেন।
অন্যদিকে এ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী চিকিৎসক নেতা ও মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. এ কে এম ফজলুল হক। স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত রয়েছেন তিনি। দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বাছাইয়ে মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় নির্বাচনী প্রস্তুতিতে মাঝখানে কিছুটা ছন্দপতন হয়েছিল। তবে উচ্চ আদালতের রায়ে মনোনয়ন ফিরে পেয়ে তিনি আবার পুরোদমে নির্বাচনের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে মনে হচ্ছে, আসনটিতে মূল লড়াই হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। এর বাইরে আরও আটজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকলেও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা ওয়াহেদ মুরাদ ছাড়া অন্য কারও প্রচারণা চোখে পড়ছে না।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে কোতোয়ালি আসন থেকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান। ১৯৯১ সালে ৪৯ হাজার ৮১৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ৪৮ হাজার ২৪৫ ভোট ও জামায়াত প্রার্থী আফসার উদ্দিন চৌধুরী ৮ হাজার ৩৯২ ভোট পান। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আসনটিতে ৯৯ হাজার ২৪০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের এমএ মান্নান। বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান ৮৪ হাজার ১৭১ ভোট ও জামায়াতের আফসার উদ্দিন চৌধুরী ১০ হাজার ৭২৪ ভোট পান।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-খুলশী-পাঁচলাইশ) : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ডবলমুরিং, হালিশহর, পাঁচলাইশ, খুলশী এলাকার আটটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১০ আসনে এবার বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমানের পুত্র সাঈদ আল নোমান। দলের প্রাথমিক মনোনয়নে আসনটিতে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। চূড়ান্ত মনোনয়নে আমীর খসরুকে চট্টগ্রাম-১১ আসনে দিয়ে এখানে সাঈদ আল নোমানকে প্রার্থী করা হয়। নির্বাচনের মাঠে নতুন হলেও আবদুল্লাহ আল নোমানের অনুসারীদের ব্যাপক সহযোগিতা ও সমর্থন পাচ্ছেন তিনি। পিতা আবদুল্লাহ আল নোমানও এ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন।
অবশ্য আসনটিতে প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে নির্বাচনের মাঠ গুছিয়েছেন জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী। তার মহিলা সমর্থকরাও নির্বাচনী প্রচারণায় ঘরে ঘরে ছুটছেন। একাধিকবার সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে তিনি ভালোভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। এ দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের লড়াই ইতিমধ্যে জমে উঠেছে।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) : বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে পরিচিত দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নির্বাচন করছেন চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে। নগরীর ডবলমুরিং ও বন্দর একই আসনভুক্ত থাকাকালে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে ওই আসন থেকে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। পেয়েছিলেন বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। নগরীর আসনগুলোর নতুন সীমানা নির্ধারণের পর ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এমএ লতিফের কাছে হেরে যান তিনি। এ আসনে এবার বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে ইসরাফিল খসরু চৌধুরীর নামও ছিল মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায়। দলের সাংগঠনিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে ভোটের মাঠে তিনি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন।
তবে আসনটিতে দীর্ঘদিন ধরে ভোটের মাঠে সক্রিয় জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. শফিউল আলমও ইতিমধ্যে এলাকার ভোটারদের মধ্যে ভালো স্থান করে নিয়েছেন। তাছাড়া বর্তমানে কারাবন্দি সাবেক এমপি এমএ লতিফের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্কের ইতিবাচক প্রভাব ভোটের মাঠে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
আসনটিতে এবার ১১ জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এটি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে আসছে।
মহানগরীর তিনটি আসনে ধানের শীষের প্রার্থীদের জয়লাভের দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সদস্য সচিব মো. নাজিমুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনৈতিক দল বিএনপি। এটি গত ১৭ বছর মানুষের অধিকারের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এই দলের অনেক নেতাকর্মী মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, জেলের ঘানি টেনেছেন, মামলার আসামি হয়েছেন। তাছাড়া বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে এই চট্টগ্রাম থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং ১৯৮১ সালে এই চট্টগ্রামে শাহাদাতবরণ করেছেন। জিয়াউর রহমানের রক্তে ভেজা চট্টগ্রামের মাটির সঙ্গে মিশে আছে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক। এ ছাড়া নগরীর তিনটি আসনে যারা ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন, তারা সবাই নিজ নিজ জায়গায় দক্ষতা প্রমাণ করেছেন। তাই চট্টগ্রামের মানুষ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের বেছে নেবে।’
নগরীর আসনগুলোতে জামায়াতের প্রার্থীদের বিষয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে চট্টগ্রামের মানুষ তাদের রাস্তায় দেখেনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী নেতাদের যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা ছিল, তা জনগণ এখনো ভোলেনি। তাই বিএনপির বিপরীতে গিয়ে সাধারণ ভোটাররা কখনো জামায়াত প্রার্থীদের সমর্থন দেবে বলে আমার মনে হয় না।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মুহাম্মদ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের জনগণ পরিবর্তন চায়। তারা নতুন একটি ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছে। মহিলা ও তরুণরা ঘরে ঘরে গিয়ে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর জন্য ভোট প্রার্থনা করছেন। মহানগরীর তিনটি আসনের মধ্যে চট্টগ্রাম-১০ ও ১১ আসনের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীরা জনগণের ভোটে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে মানুষের সেবা করেছেন, এলাকার জন্য কাজ করেছেন। মাঠপর্যায়ে তাদের যথেষ্ট পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। চট্টগ্রাম-৯ আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আগে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক কাজে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সেখানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন। যদি ভোটে কোনো ধরনের কারচুপি বা ভোটডাকাতি না হয়, তাহলে আমাদের প্রার্থীরা জয়লাভ করবে বলে আমরা আশাবাদী।’
