ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলো থেকে গ্রামমুখী মানুষের ঢল নেমেছে। দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগের আশায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি ফেরার এ দৃশ্য যেন ঈদের ছুটির আবহ তৈরি করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনগুলোতে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়ে। ঢাকা শহর অনেকটাই ফাঁকা থাকলেও মহাসড়কে ছিল যানজট। যাত্রীদের চাপ বেশি থাকায় কৌশলে বিভিন্ন পরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল এবং কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে সকাল থেকেই যাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকে। সূর্য ওঠার আগেই অসংখ্য মানুষ প্ল্যাটফর্ম ও কাউন্টারে জড়ো হন। সবার চোখেমুখে এক ধরনের প্রত্যাশা ও আনন্দের ছাপ। বগির ভেতর জায়গা না পেয়ে যাত্রীরা ছাদে উঠে পড়ছেন। ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ভোটের টানই বেশি বলে জানান তারা। তাছাড়া, শ্রমজীবী মানুষদের ট্রেন-বাসের পাশাপাশি ট্রাকে করেও গন্তব্যের দিকে ছুটতে দেখা যায়।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বহু ভোটার দুই-তিন দিনের ছুটি নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন, যেন কোনোভাবেই ভোট দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া না হয়। সস্ত্রীক দুই সন্তান নিয়ে বাড়ি ফিরছেন আরাফাত হোসেন। তিনি বলেন, অনেক দিন পর এবার নির্বিঘেœ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারব এ আশায় পরিবার নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি।
একই রকম উচ্ছ্বাস দেখা গেছে আরেকটি পরিবারের মধ্যেও। সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক ভোটার। তিনি জানান, আগের তিনটি নির্বাচনে তারা ভোট দিতে পারেননি। কখনো কেন্দ্রে গিয়ে ভোট না দিয়েই ফিরতে হয়েছে, কারণ তাদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এবারই প্রথম সুষ্ঠুভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে এ আশায় তারা বাড়ি ফিরছেন।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নবীনগর, সাভার বাসস্ট্যান্ড, আমিনবাজার এবং নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পল্লী বিদ্যুৎ, বাইপাইল, আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের আশুলিয়া ও জামগড়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ দেখা গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে উত্তরা-আজমপুর-কলেজ গেট-গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ব্যাপক যানজট লক্ষ করা যায়। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ তিন ঘণ্টার পথ হলেও গতকাল তা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগেছে বলে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ রুটে একমাত্র ‘গেটলক’ সার্ভিস হওয়ায় ইউনাইটেড বাসের টিকিট কাউন্টারে দুপুরের দিকেও শতাধিক মানুষের লম্বা লাইন দেখা যায়। সেখানে টিকিট কাটতে আসা এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেন, কাকলী থেকেই সাধারণত বাসে উঠি, কিন্তু আজ সব বাস ৪০০-৫০০ টাকা ভাড়া চাইছে। তাই বাধ্য হয়ে মহাখালী এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি।
পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্বাচনের কারণে যাত্রীসংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। এ অবস্থায় অনেক রুটে অতিরিক্ত বাস ও ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপর রয়েছে।
ভোগান্তি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ: উৎসবমুখর যাত্রার মাঝেই ভোগান্তি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। মহাখালী বাস টার্মিনালে বাসের টিকিট সংগ্রহ করতে যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেক রুটে আগেভাগে টিকিট না কাটায় শেষমুহূর্তে বিপাকে পড়ছেন যাত্রীরা।
সরেজমিনে বনানী-কাকলী এলাকায় দেখা যায়, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুরগামী বাসগুলো মহাখালী থেকেই পূর্ণ হয়ে আসছে। পথে যাত্রী তুলতে গিয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া দাবি করছে কিছু পরিবহন। সাধারণত মহাখালী-বনানী থেকে ময়মনসিংহ যেতে ভাড়া লাগে ২০০-২৫০ টাকা। ময়মনসিংহ রুটে সৌখিন পরিবহন বাসে যেখানে স্টেশন থেকে টিকিটের দাম নিচ্ছে ৩২০, সেখানে স্টেশন পার হতেই ৫০০ টাকার নিচে যাত্রী তুলছে না। একই অভিযোগ উঠেছে জামালপুরগামী রাজিব ও নেত্রকোনাগামী শাহ জালাল পরিবহন, শেরপুরগামী সোনার বাংলা বাসের বিরুদ্ধেও। তবে ফুলবাড়িয়াগামী আলম এশিয়া, শ্যামলী বাংলা ও ইমাম, ইসলামসহ অন্যান্য পরিবহন ১০০ টাকা কমে ৪০০ টাকায় যাত্রী পরিবহন করছে বলে জানা গেছে।
বাসের ভাড়া বেশি নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে সৌখিন বাসের দুজন হেলপার জানান, প্রচ- যানজটের কারণে যাতায়াতে দ্বিগুণ সময় লাগছে। ফলে তারা নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছেন না, এজন্য কিছুটা বেশি ভাড়া আদায় করছেন।
এদিকে, নির্বাচন উপলক্ষে সরকার ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারি বিশেষ ছুটি দেওয়া হয়েছে।
সদরঘাটে উপচেপড়া ভিড় : সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও ঘরমুখো যাত্রীদের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলমুখী রুটের লঞ্চগুলোতে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী দেখা গেছে। অনেকেই টিকিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে, এমনকি ডেকে বসে যাত্রা করছেন।
গতকাল সকাল থেকেই সদরঘাট এলাকায় ভিড় বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। টার্মিনালের ভেতরে চলাচলের জায়গা কমে যায় এবং বাইরে সড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। পরিবার নিয়ে আসা যাত্রীদের মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও নারীদের ভোগান্তি ছিল চোখে পড়ার মতো।
মাদারীপুরের যাত্রী সুমাইয়া দুই সন্তান নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কষ্টকর। তবু ভোটের সময় এটা হতেই পারে। তাই ঝামেলা মেনে নিয়েছি।’ বরিশালগামী যাত্রী আবদুল মান্নান বলেন, ‘নির্বাচনের ছুটি পেয়েই বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। টিকিট কেটেও লঞ্চে উঠতে অনেক সময় লেগেছে। তবুও ভোট দিতে বাড়ি যেতে পারছি, এটাই স্বস্তির।’
যাত্রীদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আব্দুল ওয়ারীশ বলেন, ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। যেহেতু স্বাভাবিক দিনের তুলনায় বেশি যাত্রী বাড়ি যাচ্ছেন, তাই নৌ টহলও বাড়ানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আশা করি সবাই নির্বিঘেœ বাড়ি ফিরতে পারবেন।’
এদিকে আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গত সোমবার বিকেলে গাজীপুরের পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে নিজ নিজ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে গাজীপুর ছেড়ে যাচ্ছেন লাখো মানুষ। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী, বোর্ডবাজার, ভোগড়া বাইপাস, চান্দনা চৌরাস্তা, কোনাবাড়ি, কালিয়াকৈর চন্দ্রা মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং বাসস্ট্যান্ডে বাস ও গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন যাত্রীরা। যাত্রীদের এ চাপ জয়দেবপুর ও টঙ্গী রেলস্টেশনেও দেখা গেছে।
গতকাল সকালে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার গাজীপুর ভোগড়া বাইপাস পেয়ারা বাগান বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য যাত্রী বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের প্রায় সবাই উত্তরবঙ্গের। আমজাদ আলী নামে এক যাত্রী জানালেন, রংপুর যাওয়ার জন্য বাস না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। মাঝেমধ্যে কয়েকটি বাস এলেও অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছে। এতে যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়।
এর মধ্যে দেখা যায়, কিছুসংখ্যক যাত্রী ছোট পিকআপে করে গন্তব্যের উদ্দেশে যাচ্ছেন। তাদের একজন ইসমাইল হোসেন জানান, বাসের ভাড়া বেশি হওয়ায় কম পয়সায় পিকআপে করে রংপুর যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবহন শ্রমিক নেতা জানান, নির্বাচনের জন্য অনেক বাস পুলিশ রিকুইজিশন করেছে। যার কারণে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা অনেক কম। তবে কিছু কিছু বাসে অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে বলে তিনি জেনেছেন।
এদিকে ঢাকা-থেকে উত্তরবঙ্গ এবং ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী সড়কের চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসগুলো অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ায় দুটি স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন যাত্রীরা। সোমবার রাত ১১টার দিকে ভোগড়া বাইপাস মোড়ে রংপুর পর্যন্ত ৮৪০ টাকার স্থলে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা করে নিচ্ছিল কয়েকটি পরিবহন। যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ সৃষ্টি করে। পরে নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি ফয়সাল আহমাদ সরকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
