ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে জাতীয় পার্টির (জাপা)। দলটি ১৯৬টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটি আসনেও জিততে পারেনি। এমনকি জাপা দুর্গ বলেখ্যাত রংপুর বিভাগেও বড় ধস নেমেছে। শুধু তাই নয়, ভোটের লড়াইয়েই টিকে থাকতে পারেননি দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী।
নির্বাচনী বেসরকারি ফল অনুযায়ী, রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৯৩৩ ভোট। আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী মো. মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু ৭৪ হাজার ১৭১ ভোট নিয়ে দ্বিতীয়। নির্বাচনের দিন জিএম কাদের নিজে ভোটকেন্দ্রে যাননি। তবে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন তিনি। এ ছাড়া গাইবান্ধা-১ আসনে জাপা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী পেয়েছেন ৩৩ হাজার ৯৭৬ ভোট পান। সেখানে জামায়াতের মো. মাজেদুর রহমান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর পর সবচেয়ে বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে জাপা। তারা ১৯৬টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে কোনো আসন পায়নি। এর আগে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও জাপা ১১টি আসন পেয়েছিল, যা দলটির ইতিহাসে ছিল সর্বনিম্ন। আর এবার দলটি শূন্য আসন পেয়ে নতুন রেকর্ড গড়ল।
নির্বাচনে জাপা যে কারণে ভরাডুবি : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে জাপা তাদের স্বকীয়তা হারিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখে দলটি জনগণ থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত হলেও দলটির ভোটাররা এবার জাতীয় পার্টিকে ভোট দেননি। অথচ দলটি আওয়ামী লীগের ভোট প্রত্যাশা করেছে। এর বাইরে জাতীয় পার্টি গত দুই দশক নেতানির্ভর দলে পরিণত হয়েছে। দলটির কর্মী ও সমর্থকরা অন্য দলে যোগ দেওয়ায় তাদের সংখ্যা দিন দিন কমছিল। এর ফল এবারের নির্বাচনে হাতেনাতে পেয়েছে দলটি।
জাপার দুর্গ ভেঙে চুরমার : দলের ‘দুর্গ’খ্যাত কুড়িগ্রাম জেলার চারটি সংসদীয় আসনে লাঙ্গল প্রতীকে দলটির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কোনোটিতেই বিজয়ী হতে পারেননি। বরং চারটি আসনের তিনটিতেই জামানত হারিয়েছেন দলটির প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশনের জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট পেতে হবে। অন্যথায় জামানত বাবদ জমা দেওয়া টাকা বাজেয়াপ্ত হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা জামানত জমা দিতে হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম-১ আসনে (ভুরুঙ্গামারী ও নগেশ্বরী) জাতীয় পার্টির পাঁচবারের সাবেক এমপি একেএম মোস্তাফিজুর রহমান দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলেও এবার আর বিজয় মুকুট পরতে পারেননি। তার আসন এবার প্রথমবারের মতো দখলে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯৭৮ ভোটারের এ আসনে ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩৯৫। এর মধ্যে জাপা প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান ৫০ হাজার ৭২৭ ভোট পেয়ে অবস্থান তৃতীয় অর্জন করেন। এই আসনে জামায়াত প্রার্থী মো. আনোয়ারুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৪১ হাজার ৯০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী সাইফুর রহমান রানা ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ২৫ ভোট।
কুড়িগ্রাম-২ আসন (সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী) ফের হাতছাড়া হয়েছে জাপার। ছয় লক্ষাধিক ভোটারের এ আসনে ভোট পড়েছে ৪ লাখ ৩ হাজার ৬৩১টি। জাপা প্রার্থী সাবেক এমপি পনির উদ্দিন আহমেদ লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন মাত্র ১৩ হাজার ৮৪৬ ভোট। তিনি জামানত হারিয়েছেন। জামানত রক্ষার জন্য তার প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ৫০ হাজার ৪৫৩ ভোট পাওয়ার প্রয়োজন ছিল। জাতীয় পার্টির ‘দুর্গ’খ্যাত আসনটি এবার চলে গেছে জামায়াত সমর্থিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দখলে।
এ আসনে এনসিপি প্রার্থী ড. আতিকুর রহমান মোজাহিদ শাপলা কলি প্রতীকে ১ লাখ ৮০ হাজার ৫২৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৪০৫ ভোট।
কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনটিতে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭০ ভোটারে বিপরীতে ভোট পড়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৯৩৫। এর মধ্যে জাপা প্রার্থী আব্দুস সোবহান লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ২ হাজার ১১২ ভোট। একটিমাত্র উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ২৮ হাজার ৪৯১ ভোট না পাওয়ায় জামানত হারিয়েছেন জাপা প্রার্থী। এ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির তাসভীর উল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫২ ভোট। ছয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে জাপা প্রার্থীর অবস্থান চতুর্থ।
কুড়িগ্রাম-৪-এ দলটির প্রার্থী কেএম ফজলুল ম-ল লাঙ্গল প্রতীকে ২ হাজার ১৮০ ভোট পেয়ে জামানত খুইয়েছেন। তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭৫৩। মোট প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ২৬ হাজার ১৪০। জামানত রক্ষার জন্য জাপা প্রার্থীর ভোট প্রয়োজন ছিল ২৮ হাজার ২৬৭ ভোট। এই আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৮ হাজার ২১০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মো. আজিজুর রহমান ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৪২৩ ভোট।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেছেন, জামানত রক্ষার জন্য প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট আসনের প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ বা সাড়ে ১২ শতাংশ ভোট পেতে হবে। অন্যথায় তিনি জামানত হারাবেন।
