পোস্টাল ব্যালটে ভাগ্য নির্ধারণ

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে একের পর এক কেন্দ্রের ফল ঘোষণা হচ্ছে। স্ক্রিনের সামনে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন গণমাধ্যমকর্মী, বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকরা। একটু পরপর দু-দলের সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়ছেন। এ অবস্থার মধ্যে ১৪৭টি কেন্দ্রের ফল ঘোষণার পর বিএনপি প্রার্থী এম আকবর আলীর সমর্থকরা চিৎকার দিয়ে একজন আরেকজনকে বুকে জড়িয়ে আলিঙ্গন করছেন। এ সময় ঘটে বিপত্তি! পরক্ষণে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে পোস্টাল ভোটে জামায়াত সমর্থক প্রার্থী মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ৫৯৪ ভোটে বিজয়ী।

এ অবস্থায় বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। আলিঙ্গন করা অবস্থায় একজন আরেকজনের মুখের দিকে চেয়ে পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই বিপরীত শিবির থেকে সেøাগানে স্লোগানে পুরো রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় মুখরিত হয়ে ওঠে। এরপর বিএনপি সমর্থকরা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে পারেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম ফল ঘোষণা করছিলেন। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ-৪) আসনে প্রাথমিক গণনায় এগিয়ে ছিলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম আকবর আলী (ধানের শীষ)। ১৪৭টি কেন্দ্রের ফলে তিনি ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৮ ভোট এবং জামায়াত জোটের প্রার্থী মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান (দাঁড়িপাল্লা) পান ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯৩ ভোট। এ সময় আকবর আলী ৭৬৫ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। তবে পোস্টাল ভোটের ফল প্রকাশের পর বিএনপি প্রার্থী পান ৮২০ ভোট, যেখানে জামায়াতের প্রার্থী পান ২ হাজার ১৭৯ ভোট। এতে জামায়াত প্রার্থী পান ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৭২ ভোট আর বিএনপি প্রার্থী পান ১ লাখ ৬১ হাজার ২৭৮ ভোট। শেষ হিসাব-নিকাশে ৫৯৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।

এদিকে একই অবস্থার সৃষ্টি হয় মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনেও পোস্টাল ভোটের ফলে জয়ী হন ১১-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা (রিকশা প্রতীক)। ওই আসনের ১০২টি কেন্দ্রে তিনি ভোট পান ৬৩ হাজার ৫১১টি এবং পোস্টাল ভোট পান ১ হাজার ৩৯৮টি। মোট ভোট দাঁড়ায় ৬৪ হাজার ৯০৯। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নাদিরা আক্তার (ধানের শীষ) সরাসরি ভোট পান ৬৪ হাজার ২৯১ এবং পোস্টালে পান মাত্র ২৩৩ ভোট। সব মিলিয়ে তার প্রাপ্ত ভোট ৬৪ হাজার ৫২৪। ফলে ৩৮৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন হানজালা। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আসনের চিত্রও একই রকম হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধনকারী ভোটারের সংখ্যা ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন। এর মধ্যে প্রবাসী পোস্টাল ভোটার (ওসিভি) ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪৬ জন এবং অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ভোটার ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৩৮ জন। সর্বশেষ কাস্টিং পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯৩টি। এর মধ্যে ৯২ হাজার ৯৬টি ভোট বিভিন্ন ত্রুটির কারণে বাতিল হয়েছে। সরাসরি জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭ জনের ভোট। এতে অনেক প্রার্থীর ভাগ্য খুলে গিয়েছে। আবার অনেক প্রার্থীর হাসি কেড়েও নিয়েছেন তারা। তাদের মধ্যে প্রবাসী ভোটার ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২০৫ জন এবং অভ্যন্তরীণ ভোটার ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৩৮৮ জন। এখনো নির্বাচন কমিশনে এসে পৌঁছায়নি ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৯১টি পোস্টার ব্যালট। এর মধ্যে কিছু ব্যালট দেশে ও প্রবাসে ভোটারের নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে ভোটারপ্রত্যাশীকে না পেয়ে ফেরত এসেছে। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টা পর আসা ব্যালট গ্রহণযোগ্য নয় বলেও জানা গেছে।

দেশ ও দেশের বাইরে থেকে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ভোটার এবার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন, যাদের অর্ধেকের বেশিই প্রবাসী। সারা বিশে^র ১২৩টি দেশ থেকে পোস্টাল ভোটের জন্য আবেদন আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সৌদি আরব থেকে আসে, যা ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৩। তার মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৭৯টি ভোট কাস্টিং হয়েছে। এ ছাড়া সবচেয়ে কম আবেদন পড়ে জিম্বাবুয়ে, কলম্বিয়া ও ক্যামেরুনসহ পাঁচ দেশে থেকে আসে একটি করে আবেদন। আর ২৪টি দেশ থেকে ১০টি কম আবেদন আসছে। এর মধ্যে শুধু পাঁচটি দেশের ১২টি ভোট কাস্টিং হয়েছে।

তবে ভোট কাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তরের ভোট বেশি বাক্সে পড়েছে। ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের পাশাপাশি দেশের ভেতরে তিন ধরনের ব্যক্তি নিবন্ধনের সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনি হেফাজতে (কারাগারে) থাকা ব্যক্তিরা। কিন্তু এই সুবিধার বাইরে ছিলেন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা।

আসনভিত্তিক পোস্টাল ভোট : সবচেয়ে বেশি ফেনী-৩ আসনে ১১ হাজার ৫৫২ জনের পোস্টাল ভোট কাস্টিং হয়েছে। এর মধ্যে প্রবাসী ভোট ৮ হাজার ৪৯৫ এবং অভ্যন্তরীণ ৩ হাজার ৫৭ জন ভোট দিয়েছেন। এরপর চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১১ হাজার ৫৩ জন, কুমিল্লা-১০ আসনে ৯ হাজার ৮৬১ এবং নোয়াখালী-১ আসনে ৯ হাজার ২৪১ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এ ছাড়া সবচেয়ে কম বাগেরহাট-৩ আসনে ১ হাজার ২০৩ জনের পোস্টাল ভোট কাস্টিং হয়েছে। এর মধ্যে ১০৩ প্রবাসী ও ১০৭৫ জন অভ্যন্তরীণ ভোটার। এ ছাড়া বিজয়ী সিরাজগঞ্জ-৪-এ পোস্টাল ব্যালটে ভোট পড়েছে ৩ হাজার ১৩০টি। এর মধ্যে প্রবাসী ৪৬৪টি এবং অভ্যন্তরীণ ২৬৬৬টি। আর মাদারীপুর-১-এ পোস্টাল ব্যালটে ২০৫৯টি। এর মধ্যে প্রবাসী ১৩৭৫টি ও অভ্যন্তরীণ ৪৮৬টি।

নির্বাচন কমিশনের ওসিভি-এসডিআই প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দেশে ও প্রবাসে মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৪ জন ভোটার ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধন করেন। তার মধ্যে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭ পোস্টাল ব্যালট গণনায় নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্ধারিত সময়ের বাইরে যেসব পোস্টাল ভোট কমিশনে এসে পৌঁছেছে, তা গণনায় নেওয়া হবে না। তবে যতদিন পোস্টাল ব্যালট আসবে, সেটা গ্রহণ করা হবে। এটা কমিশনের হিসাবেব স্বচ্ছতার জন্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত