বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারত কি তাল মেলাতে পারবে?

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩২ পিএম

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিপুল বিজয়ের পর দিল্লির পক্ষ থেকে এক ধরনের সতর্ক উষ্ণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে ‘নির্ণায়ক বিজয়ে’ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলায় দেওয়া এক বার্তায় মোদি একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে বহুমুখী সম্পর্ক জোরদারে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বার্তার সুর যতটা ভবিষ্যৎমুখী, ততটাই সতর্ক।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। ভিসা পরিষেবা স্থগিত, আন্তঃদেশীয় পরিবহন বন্ধ এবং বিমান চলাচল সীমিত হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের অচলবস্থা বিরাজ করছে। অনেক বাংলাদেশি মনে করেন, শেখ হাসিনার ‘কর্তৃত্ববাদী’ সরকারকে ভারত অন্ধভাবে সমর্থন দেওয়ায় জনমনে দিল্লির প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন বিরোধ এবং বাণিজ্যের মতো পুরনো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো।

দিল্লির জন্য বিএনপি কোনো অপরিচিত শক্তি নয়। ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হয়েছিল। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় প্রদান এবং ২০০৪ সালের ১০ ট্রাক অস্ত্র চালানের মতো ঘটনাগুলো দিল্লির মনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছিল। ফলে নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারত পরবর্তী ১৫ বছর শেখ হাসিনার সরকারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিল।

হাসিনা সরকারের পতনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গত ১৪ বছরে প্রথমবারের মতো করাচি-ঢাকা সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও কূটনৈতিক সফর বিনিময় হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য বেড়েছে ২৭ শতাংশ। বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়েক মনে করেন, এটি সার্বভৌম দেশের অধিকার হলেও দিল্লির জন্য এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়।

সম্পর্ক মেরামতের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রবল জনদাবি থাকলেও দিল্লি তাতে সম্মত নয়। ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, ভারত যদি তার মাটি ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করে, তবে তা ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে।

সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক জনসভায় ঘোষণা করেছেন, দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ। এটি তার স্বতন্ত্র ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোয়াস-এর অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, বিএনপি এই মুহূর্তে ভারতের জন্য সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তি। তারেক রহমান সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছেন, তবে এটি বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জিং হবে।

ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে দুই দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বার্ষিক সামরিক মহড়া ও ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণসহ নানা ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো বিদ্যমান।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকেই প্রথম বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে হবে। অতীতের তিক্ততা ভুলে একটি ‘ব্যবস্থাপিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র বদলে প্রজ্ঞাবান ও বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকে এগোলে দুই দেশেরই মঙ্গল। সম্পর্ক পুনর্গঠনের চাবিকাঠি এখন দিল্লির আত্মবিশ্বাস এবং ঢাকার নতুন নেতৃত্বের পরিপক্কতার ওপর নির্ভর করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত