‘যে দেশে মানুষ যেমন, তার দেশও তেমন’ এ বাক্যটি শুনতে সরল, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের গভীরতম সত্যগুলোর একটি এতে লুকিয়ে আছে। রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত শক্তি নয়; এটি মানুষের আচরণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও সামাজিক চর্চার সমষ্টিগত রূপ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের সামনে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, তা এ সত্যকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। দেশের মানুষ অধীর অপেক্ষায় আছে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপ দেখার। সেই বাংলাদেশ তারেক রহমানের বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশ নতুন প্রজন্মের-তরুণ সমাজের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ।
বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। যুগপৎ আন্দোলনে তাদের শরিকরাও থাকবেন সরকারে। আগামীকাল সকালে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের পর বিকেলে শপথ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভা। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিতর্ক ও মেরূকরণের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল অনেকের কাছে এক নতুন সূচনা। নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান বলেছেন, ‘এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ পুনর্গঠনের এ যাত্রায় আপনি, আমি, আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।’ তিনি স্পষ্ট ভাষায় আরও বলেছেন, ‘যেকোনো মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো ধরনের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকা- বরদাশত করা হবে না।।’ তার মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সব চেষ্টাই বৃথা যাবে। তিনি প্রতিহিংসা নয়, রাজনৈতিক সহনশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন। বিরোধীদের প্রতি সম্মান দেখানোর কথাও বলেছেন এবং সংসদকে কার্যকর বিতর্কের জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এ ভাষা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু গণতন্ত্রে ভাষা ও বাস্তবতার মধ্যবর্তী ব্যবধানই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তারেক রহমান উত্তীর্ণ হবেন বুকের ভেতর এ প্রত্যাশা আমাদের রাখতেই হবে। আর তিনি যদি সেটা করতে না পারেন, তাহলে ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত জীবনে তার যে রাজনৈতিক প্রস্তুতি, নিজেকে সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো করে তিলে তিলে গড়ে তোলা সবই বৃথা যাবে।
আমরা জানি নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাধারণ ঘটনা নয়। এটি কোনো দলের হাতে দেশের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিরল সুযোগ এনে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন, বিচার সংস্কার এসব বাস্তবায়নে শক্ত ম্যান্ডেট সহায়ক। কিন্তু দেশের ইতিহাস বলছে, বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো কখনো ক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। আর এতে জবাবদিহির সংস্কৃতি দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে। তাই আজকের প্রশ্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ম্যান্ডেট কি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি ক্ষমতাকে একমুখী করবে? আসলে নেতৃত্বের পরিপক্বতার ওপর নির্ভর করবে এ প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা দায়িত্ব বাড়ায়।’ এ স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা শাসনের অধিকার দেয়, কিন্তু বৈধতা আসে অন্তর্ভুক্তি থেকে। বিরোধী কণ্ঠকে জায়গা না দিলে, নীতিনির্ধারণে অংশীদারত্ব না দিলে, সংসদীয় বিতর্ককে কার্যকর না করলে সংখ্যার শক্তি টেকসই হয় না।
জাতীয় ঐক্য অনেক সময় আবেগময় শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এটি আসলে একটি কাঠামোগত বিষয়। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব যদি দলীয় আনুগত্যের বাইরে নিরপেক্ষভাবে কাজ না করে, তবে ঐক্য টেকে না। আর রাষ্ট্র যদি সবার জন্য সমানভাবে কাজ না করে, নাগরিক আস্থা গড়ে ওঠে না।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষের অংশগ্রহণ ছিল বিস্তৃত। কিন্তু এটিও সত্য যে, সব নাগরিক সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার পরিবেশ পাননি। অর্থবল, পেশিশক্তি, সামাজিক ও ধর্মীয় চাপ এখনো এ দেশের নির্বাচনী বাস্তবতার অংশ। ফলে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পরিবেশ সবসময় সহজ ছিল না। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই অসমতাকে স্বীকার করতে হবে। ঐক্য মানে সবাই এক কথা বলবে এমন নয়। বরং ভিন্নমতকে ন্যায্য নিয়মে পরিচালনা করার সক্ষমতাই ঐক্য।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা কাজ করেছে বিজয় মানেই সবকিছু দখল। প্রশাসন, অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান সবকিছু ক্ষমতার সম্প্রসারণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এ সংস্কৃতি অতীতে গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে। অতীত থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতেও দুর্বল করবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার যদি সত্যিই নতুন অধ্যায় রচনা করতে চায়, তবে তাকে এ মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে; কিন্তু তা শত্রুতায় রূপ নেবে না এ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
রাষ্ট্র দুর্বল হলে মব শক্তিশালী হয় এটি শুধু তত্ত্ব নয়, সাম্প্রতিক বাস্তবতা। গত দেড় বছরে গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি, সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়িয়ে সহিংসতা, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ এসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আইনের শাসন দৃশ্যমান না হলে জনতা নিজেই রায় দিতে চায়। আইন হাতে তুলে নিতে চায়, যা কোনো সভ্য সমাজেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তারেক রহমান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। আইন হবে সবার জন্য সমান এ বার্তাই রাষ্ট্রের শক্তি। মব সংস্কৃতি রোধে রাজনৈতিক ভাষার দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। নেতাদের বক্তব্য মাঠপর্যায়ে আচরণকে প্রভাবিত করে। সংযত ভাষা সংযত সমাজ তৈরি করবে বলেই আমরা আশা করি।
এবারের নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি একটি বাস্তবতা। এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সমীকরণ ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের ফল। কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকতে হবে অসাম্প্রদায়িকতা মানে ধর্মবিরোধিতা নয়; বরং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা। জাতীয় ঐক্য কোনো এক পরিচয়ের আধিপত্যে টেকে না। সংখ্যালঘু নিরাপদ না হলে, নারী সমান সুযোগ না পেলে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অংশীদার না হলে ঐক্য টেকসই হয় না। রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হবে।
ক্ষমতা দিয়ে শাসন করা যায়; কিন্তু স্থায়িত্ব আসে আস্থা থেকে। জবাবদিহি ছাড়া আস্থা জন্মায় না। তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেছেন, সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। দেশের ইতিহাসে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অনেকেই লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এ সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রকাশ, সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতাএসবই এখন জোরদার করার সময়।
আর জাতীয় ঐক্য শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক পূর্বশর্তও। বিনিয়োগকারীরা বাজারের পাশাপাশি নীতির ধারাবাহিকতা এবং আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিও বিবেচনা করেন। যখন প্রতিষ্ঠান নিয়মভিত্তিক হয়, তখন আস্থা বাড়ে। দুর্বল আইন বিনিয়োগ কমায়। আর বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। কর্মসংস্থান কমলে অসন্তোষ বাড়ে। অসন্তোষ রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। এ চক্র ভাঙতে হলে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি অপরিহার্য।
আমরা প্রায়ই শাসকদের দিকে আঙুল তুলি। অবশ্যই জবাবদিহি তাদের আছে। কিন্তু নাগরিকেরও কি নেই? গণতন্ত্র শুধু শাসকের পরীক্ষা নয়, নাগরিকেরও পরীক্ষা। ভোটের দিনে, কর দেওয়ার সময়ে, ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন আমরা রাষ্ট্রকে তৈরি করি। রাষ্ট্র আসলে একটি আয়না। সেখানে প্রতিফলিত হয় আমাদের সম্মিলিত নৈতিকতা। নাগরিক হিসেবে আমরা যতটা দায়িত্বশীল, রাষ্ট্র ততটাই দৃঢ়। আমরা যতটা উদাসীন, রাষ্ট্র ততটাই দুর্বল। এই দেশে আমরা যেমন আচরণ করি, দেশও তেমনই রূপ নেয়। যদি আমরা বিভাজনকে পোষণ করি, দেশ বিভক্ত হবে। যদি আমরা সহনশীলতা চর্চা করি, দেশও সহনশীল হবে। যদি আমরা সত্যকে গুরুত্ব দিই, মিথ্যা টিকবে না। রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত মানুষের সমষ্টিগত বিবেকের প্রতিফলন। তাই পরিবর্তনের প্রশ্নে শুধু সরকার বদল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মন বদল। প্রয়োজন নাগরিকত্বের নতুন চর্চা। প্রশ্নটা আসলে সহজ আমরা কেমন দেশ চাই? আর তার আগে জানতে হবে আমরা কেমন মানুষ হতে চাই। অথবা আমরা কেমন মানুষ হয়েছি।
রাষ্ট্রের আয়নায় তাকালে যে মুখটি দেখা যায়, সেটি অন্য কারও নয় আমাদেরই। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য আর রাজনৈতিক বাস্তবতা এ দুয়ের ব্যবধানই বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা অতীতে বহুবার শুনেছি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি; কিন্তু বাস্তবে দেখেছি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ। ফলে জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে এবার কি সত্যিই ভিন্ন কিছু হবে? আমরা বলি হতেই হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সমানে আর কোনো বিকল্প নেই। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে সুযোগ এবং জনগণের ম্যান্ডেট বিএনপি পেয়েছে, সেই সুযোগ সহজে কেউ পায় না।
গণতন্ত্র শুধু সরকার গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আচরণগত সংস্কৃতি। নির্বাচনের পর প্রতিপক্ষকে কতটা মর্যাদা দেওয়া হলো, সংসদে বিরোধী কণ্ঠ কতটা শোনা হলো, আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা কতটা বজায় থাকল এসবই নতুন সরকারের পরীক্ষা। একই সঙ্গে বিরোধী দলেরও পরীক্ষা আছে তারা কি সত্যিই দায়িত্বশীল সমালোচনা করবে নাকি আবারও রাজপথনির্ভর সংঘাতে ফিরে যাবে?
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। নতুন প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন; বিরোধী দলও দায়িত্বশীল ভূমিকার ইঙ্গিত দিয়েছে। এটি একটি সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা বাস্তব হবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নাগরিক চাপ, এ দুয়ের ওপর। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে কার্যকর দ্বিদলীয় বা বহুদলীয় ভারসাম্য হারিয়েছে। এখন যদি সরকার ও বিরোধী উভয়পক্ষই দায়িত্বশীল আচরণ করে, তাহলে একটি নতুন সংসদীয় সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি হতে পারে। আমরা সেই স্বপ্ন দেখেই যাব।
১২ ফেব্রুয়ারির ম্যান্ডেট একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এটি সংখ্যার নয়, চরিত্রের পরীক্ষা। তারেক রহমান বলেছেন, তিনি প্রতিহিংসার নয়, পুনর্গঠনের রাজনীতি চান। এখন সময় সেই কথাকে কাঠামোয় রূপ দেওয়ার। যদি আইন সবার জন্য সমান হয়, যদি সংসদ বিতর্কের জায়গা হয়, যদি নাগরিক রাষ্ট্রকে নিজের মনে করেন তবেই বিএনপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপিত হবে। রাষ্ট্রের আয়নায় আজ আমরা নিজেদেরই দেখছি। প্রশ্ন একটাই আমরা কেমন মানুষ হতে চাই? কারণ, দেশ শেষ পর্যন্ত আমাদেরই প্রতিচ্ছবি।
লেখক : সম্পাদক, দেশ রূপান্তর ও বহুমাত্রিক লেখক
