‘বন্দি অধিকার’ বিক্রি টাকার বিনিময়ে

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৭ এএম

ভয়ংকর ‘বাণিজ্যকেন্দ্র’ হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার। টাকার বিনিময়ে বন্দিদের স্বাভাবিক অধিকার বিক্রি হচ্ছে। টাকা দিলেই বন্দিরা পাচ্ছেন ভালো সিট ও মেডিকেলে থাকার সুযোগ। কারাভ্যন্তরে অবাধে ঢুকছে মাদক ও মোবাইল ফোন। অভিযোগ, কিছু কারারক্ষী জুতার ভেতরে লুকিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ছাড়াও অবস্থাসম্পন্ন বন্দিদের কাছে ছোট আকারের মোবাইল ফোন সরবরাহ করছেন। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক মামলায় জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের ‘মুক্তি বাণিজ্য’ চলছে। কিছু কারা কর্মকর্তার পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকজন কারাপরিদর্শকও অনিয়মে জড়িত বলে একটি গেেেয়ন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, গভীর রাতে টয়লেটে গিয়ে স্বজন ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন কারাবন্দি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতারা। ওয়ার্ডের কারারক্ষীদের ম্যানেজ করে প্রতিদিন নিয়ম করে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন তারা। পলিথিনে মুড়িয়ে এবং একটি সুতার সাহায্যে মোবাইল ফোন লুকিয়ে রাখা হচ্ছে টয়লেটের কমোডের ভেতর। সুবিধামতো সময়ে কমোড থেকে তোলা হয় পলিথিন মোড়ানো মোবাইল ফোন। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘কারাগার নিয়ে এসব অভিযোগ ঠিক নয়। কারাগারের অনিয়ম, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। এ কারাগারে ২০০ ওয়ার্ড আছে। জনবল কম। ম্যান টু ম্যান নজরদারি করা সম্ভব নয়।’   

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি আছেন চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ লতিফ, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা মো. নেজাম উদ্দিন নদভী এবং চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দির সংখ্যা চার-পাঁচ গুণ বেড়েছে বলে খবর রয়েছে। এ সুযোগে বিভিন্ন স্তরের কারারক্ষী ও কারাকর্তা বন্দি-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। কারাগারে সিট বাণিজ্য করে প্রতিমাসে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশ না করে এক কারা কর্মকর্তা জানান, ‘বন্দি বেড়ে গেলে বিত্তবানরা টাকা দিয়ে আরাম-আয়েশে থাকার চেষ্টা করেন। টাকা নিয়ে সুযোগ-সুবিধা দেন কিছু কারারক্ষী। সবচেয়ে বেশি ঘটে মাদকদ্রব্য সরবরাহ এবং মোবাইল ফোন সেট বিক্রি। অতিরিক্ত দামে কেনা ছোট আকৃতির ফোন নিজেদের কাছে কৌশলে লুকিয়ে রাখেন কয়েদিরা। অভিযোগ আছে, গভীর রাতে ফটকে দায়িত্বরত কারারক্ষীদের ম্যানেজ করে রাজনৈতিক নেতা বা ভিআইপি বন্দিদের জন্য বাসায় রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘চাহিদামতো টাকা না পেলে বন্দির ওপর নির্যাতন নেমে আসে। দরজা বা টয়লেটের পাশে বিছানা পেতে বন্দিকে রাত কাটাতে বাধ্য করেন ওয়ার্ডের কারারক্ষীরা। পাশাপাশি চলছে রাজনৈতিক মামলায় জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের নিয়ে জেল গেটে ‘মুক্তি বাণিজ্য’। নতুন মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে কারাগারের একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।’

এসব অনিয়মে জেলার, ডেপুটি জেলার, কারারক্ষী ও খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী কিছু ঠিকাদার জড়িত বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

সূত্র জানায়, মাছ-মাংস ও সবজিবোঝাই গাড়ির মধ্যে লুকিয়ে কারাগারের ভেতরে মোবাইল  ফোন  ঢোকানো হচ্ছে।  মোবাইল ব্যবহার করে বন্দিরা কারাগার থেকে বাইরে চাঁদাবাজি, খুনের হুমকি দেওয়া প্রভৃতি অপরাধমূলক কর্মকা- চালাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, জেলার সৈয়দ শাহ শরীফের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। টাকার বিনিময়ে ডা-াবেড়ি থেকে মুক্তি, কারা হাসপাতালকে বিলাসবহুল বিশ্রামাগারে পরিণত করার মতো ঘটনা ঘটছে। কারা হাসপাতালে অসুস্থ বন্দিরা চিকিৎসা পাচ্ছেন না। কারা হাসপাতাল হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক নেতা ও বিত্তশালী বন্দিদের ‘বিশেষ বিশ্রামাগার’। সেখানে সিট পেতে বিনিময় করতে হচ্ছে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। প্রতিমাসে বন্দিরা কারা কর্মকর্তাদের ১০-১৫ হাজার টাকা দিচ্ছেন। জানা গেছে, কারা হাসপাতালে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী আছেন। তারা টাকার বিনিময়ে সেখানে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন।

অভিযোগ আছে, সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ যুবলীগ-ছাত্রলীগের বড় ও মাঝারি পর্যায়ের অন্তত ৮ জন নেতা প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে কারা হাসপাতালে থাকছেন। চিকিৎসার নামে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১২ নম্বর হৃদরোগ ওয়ার্ডে ‘চিকিৎসা’ নিচ্ছেন কারাবন্দি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল জাব্বার। কারাসূত্র জানায়, সম্প্রতি উচ্চআদালত থেকে জামিন পেয়েছেন হত্যা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজিসহ অন্তত ৪০ মামলার আসামি চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইসমাঈল হোসেন ওরফে টেম্পু। নতুন কোনো মামলায় যাতে তাকে গ্রেপ্তার করা না হয় সেজন্য ‘আ’ আদ্যাক্ষরের এক বেসরকারি কারাপরিদর্শক পুলিশের কাছে তদবির করেন। কিন্তু তার তদবির আমলে নেওয়া হয়নি। নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় টেম্পুকে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সহকারী প্রধান কারারক্ষী ছিলেন তারিকুল ইসলাম শাহীন। বন্দিদের কাছে মাদক সরবরাহের অভিযোগে ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর তিনি চাকরি হারান। কারা অধিদপ্তর জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন কারাগারে টাকার বিনিময়ে বন্দিদের কাছে মাদকদ্রব্য, মোবাইল  ফোন সরবরাহসহ বিভিন্ন অভিযোগে এ পর্যন্ত অন্তত ৫১ কারারক্ষী শাস্তি পেয়েছেন; চাকরি হারিয়েছেন ছয়জন। কারা অধিদপ্তরের একটি প্রতিবেদনের সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগের অধীন ১১ কারাগারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপরাধে জড়িত চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার, কক্সবাজার জেলা কারাগার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার ও নোয়াখালী জেলা কারাগারের কারারক্ষীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত