বিএফআইইউর সাবেক প্রধানের দুর্নীতি

৩ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য দুদকে

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:১২ এএম

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক প্রধান এএফএম শাহিনুল ইসলামের ব্যাংক হিসাবে তিন বছরে দুই কোটি ৯৭ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া তিনি গোপনে স্ত্রী ও শ্বশুরের নামে ফ্ল্যাট ক্রয় ও ব্যাংক ব্যালেন্স করেছেন। এসব অর্থ অনৈতিক কাজে আয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশন এ অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করেছে।

দুদকের পরিচালক ঈশিতা রনি স্বাক্ষরিত অভিযোগ অনুসন্ধান এক চিঠিতে বলা হয়, বিএফআইইউর সাবেক প্রধান এএফএম শাহিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের নিমিত্তে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ওই চিঠির পর দুদকের মানিলন্ডারিং শাখার একজন উপরিচালককে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, শাহীনুল ইসলাম বিএফআইইউর প্রধান থাকাকালে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিসহ শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে তুলে অর্থ আদায় করতেন। অনেকে তাকে ক্যাশ বা চেক দিতেন। সেই অর্থের একটি তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা হতো। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠার পর দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের একটি দল গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বিএফআইইউতে অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে অভিযোগের সত্যতাও মিলে। এরপরই অনুসন্ধানের নামে দুদক।

জানা গেছে, দুদক টিম অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র বিভিন্ন দপ্তর থেকে সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে পাঠানো কিছু তথ্য দেশ রূপান্তরের হাতে এসে পৌঁছেছে। তাতে দেখা যায়, শাহীনুল ইসলাম ২০০৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় একটি হিসাব (নম্বর-১০৫-১০১০-১১২৬৮২) চালু করেন। ওই হিসাবে ২০২২ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন বছরে তিন কোটি ৮৭ লাখ ২২ হাজার ১০৯ টাকা লেনদেন। যা তার আয়ের সঙ্গে মিল নেই। এ ছাড়া তার রূপালী ব্যাংকের রাজশাহী শাখার হিসাবে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১০ লাখ ১৮ হাজার টাকা লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া তার মোবাইল ব্যাংকিং (রকেট) এক বছরে ৩৭ হাজার ৮০০ টাকা লেনদেন। হয়েছে। তার ব্যক্তিগত হিসাবে মোট ২ কোটি ৯৭ লাখ ৭৭ হাজার ৯০৯ টাকা লেনদেন অস্বাভাবিক বলে মনে করছে দুদক।

দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, কানাডায় তার মেয়ের কাছে একটি বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ কোটি ৮০ হাজার ৯৩৫ টাকা পাচার করেছেন বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। যা তিনি আয়কর রিটার্ন গোপন করেছেন। শাহীনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, করফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখার সময় এসব দুর্নীতি বেরিয়ে আসে। এ ছাড়া তার নামে একাধিক ব্যাংকের একাধিক ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এসব কার্ডে প্রচুর লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে বিকাশ ও রকেট অ্যাকাউন্টেও বিপুল লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শাহীনুল ইসলাম অবৈধ অর্থ গোপন রাখতে স্ত্রীর নামে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় ১১০৫ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। আয়কর নথিতে ওই ফ্ল্যাটের দলিল মূল্য দেখানো হয়েছে ৩১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বাস্তবে ফ্ল্যাটটির মূল্য ১ কোটি টাকার বেশি। ফ্ল্যাটটি স্ত্রীর সুমা ইসলামের আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হলেও শাহীনুলের আয়কর রিটার্ন নথিতে উল্লেখ করেননি। বর্তমানে তারা শ্বশুরের কেনা একটি ফ্ল্যাটে থাকেন বলে জানান। কিন্তু তার শ্বশুরও কখনো আয়কর রিটার্ন দাখিল করেননি এবং ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য তাও গোপন রাখেন। শাহীনুল ইসলামের আয়কর ফাইলে এফডিআরের কোনো তথ্য না থাকলেও একাধিক এফডিআর পাওয়া গেছে। তিনি অবৈধ অর্থ বৈধ করতে স্ত্রী ও শ্বশুরের নামে গোপনে সম্পদ ক্রয় করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে শাহীনুল ইসলামকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক থেকে দুই বছরের জন্য বিএফআইইউর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই বছরের ১৮ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ওইদিন তাকে ছুটিতে পাঠায় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় একটি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তদন্ত কমিটির বিষয়ে ওইদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিএফআইইউর প্রধানকে নিয়ে তদন্ত চলছে। এখন তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে রাখা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তার বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, তদন্তে শাহীনুলের বিরুদ্ধে ওঠা ভিডিও কেলেঙ্কারি ও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহর ব্যাংক হিসাব জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিতর্কিত ব্যবসায়ী খন্দকার এনায়েত উল্লাহর জব্দ করা হিসাব থেকে ১৯ কোটি টাকা উত্তোলনের সুযোগ দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া তার নিজস্ব ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবেও অস্বাভাবিক নগদ জমার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আপত্তিকর ভিডিও ফরেনসিক পরীক্ষায় সত্যতা মিলেছে। এরপরই গত ৯ সেপ্টেম্বর আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউয়ের প্রধান শাহীনুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল সোমবার বিকেলে শাহীনুল ইসলামের মোবাইলফোনে কল দেওয়া হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত