কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে বিএনপি। আজ মঙ্গলবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবে দলটি। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনা এসেছে কে হচ্ছেন আগামী দিনের রাষ্ট্রপতি। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে সবার আগে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এরপর আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। এই তালিকা থেকেই একজন হতে পারেন দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতি। আজ মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথের পরই অনেকটা স্পষ্ট হতে পারে, কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।

বিএনপি সরকার গঠন করলে কে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন আমরা শপথ ও সরকার গঠন নিয়ে ব্যস্ত রয়েছি। বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ এখনো রয়েছে। সরকার গঠন করার পর রাষ্ট্রপতি নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান রাষ্ট্রপতিতে বিএনপি সম্মানজনকভাবে বিদায় দেবে। ইতিমধ্যে তার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় বর্তমান রাষ্ট্রপতি সন্তুষ্ট।’

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করার পর প্রয়াত এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। নিয়োগের সাত মাসের মাথায় তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেয় বিএনপি। এর আগে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি করেছিল দলটি।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২২তম রাষ্ট্রপতি। বিএনপি সরকার গঠন করার পর যিনি রাষ্ট্রপতি হবেন, তিনি হবেন ২৩তম রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যেতে চান। নতুন সরকার গঠনের পরপরই বর্তমান রাষ্ট্রপতি। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ৭৫ বছর বয়সী মো. সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগের বিষয়ে তিনি গত ডিসেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ৭৫ বছর বয়সী মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ পাঁচ বছর। সে হিসেবে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মেয়াদ আছে মো. সাহাবুদ্দিনের। যদিও সে সময় পর্যন্ত তিনি পদে থাকছেন না, যা স্পষ্ট হয়েছে রয়টার্সের সঙ্গে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারে।

পদত্যাগের বিষয়ে রয়টার্সকে তিনি বলেছিলেন, ‘সব কনস্যুলেট, দূতাবাস ও হাইকমিশনে রাষ্ট্রপতির প্রতিকৃতি, রাষ্ট্রপতির ছবি ছিল। হঠাৎ এক রাতেই সেগুলো উধাও করে ফেলা হয়। এতে মানুষের কাছে ভুল বার্তা গেছে যে সম্ভবত রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে আমি খুবই অপমানিত বোধ করেছি।’ তবে নির্বাচন পর্যন্ত আছেন জানিয়ে মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ‘নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া উচিত। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে থাকায় আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’

তালিকায় থাকা বিএনপির সিনিয়র নেতাদের রাজনৈতিক জীবন : বিএনপি মহাসচিব ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যখন দেশব্যাপী আন্দোলন চলছে, তখন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করার পর দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলটির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে ৯৮টির বেশি মামলা হয়েছিল।

মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পান। আওয়ামী লীগের রমেশ চন্দ্র সেনকে পরাজিত করেন তিনি। ওই সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রথমে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে তিনি জয় পান। পরে শপথগ্রহণ না করায় নির্বাচন কমিশন তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পর জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ। ৭৯ বছর বয়সী খন্দকার মোশাররফ কুমিল্লা-১ আসন থেকে এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে চারবার সংসদ সদস্য হন তিনি (১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ১২ জুন এবং ২০০১)। খন্দকার মোশাররফ দলের কার্যক্রমে কিছুটা কম সক্রিয়। নিজেকে কিছুটা আড়ালে রাখেন, যাতে তাকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি না হয়।

খন্দকার মোশাররফ হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৯১ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি জ¦ালানিমন্ত্রী হন। ২০০১ সালে হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আদায়ে সংগঠকের ভূমিকায় ছিলেন। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় খন্দকার মোশাররফ বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সরকার গঠনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন এমন নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামটি আলোচনায় থাকলেও তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করার পরামর্শ রয়েছে দলের ভেতর। খালেদা জিয়ার জানাজায় বিপুল জমায়েতে দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিয়েছেন নজরুল ইসলাম খান। এবার বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটিরও আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। সর্বশেষ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

এ ছাড়া দলটির আরেক সিনিয়র নেতা আবদুল মঈন খান এবার নিয়ে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নরসিংদী-২ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৩-৯৬ মেয়াদে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে তিনি তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এ ছাড়া ওই সরকারের সময়ই তিনি বিজ্ঞান ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘স্থায়ী কমিটি’র সদস্য হন মঈন খান।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবু সাঈদ চৌধুরী, মোহাম্মদউল্লাহ (প্রথমে ভারপ্রাপ্ত), মোহাম্মদউল্লাহ, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি), আবদুস সাত্তার, আ ফ ম আহসানউদ্দিন চৌধুরী, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, সাহাবুদ্দীন আহমদ, আবদুর রহমান বিশ্বাস, সাহাবুদ্দীন আহমদ, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, মো. জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ এবং বর্তমানে মো. সাহাবুদ্দিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত