ডায়াবেটিস চিকিৎসার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো খাদ্য গ্রহণে শৃঙ্খলা আনয়ন করা। রমজান মাসে আমাদের খাদ্য শৃঙ্খলায় কিছুটা ব্যত্যয় ঘটে। রোজার মাসে দীর্ঘ সময় না খেয়ে
থাকতে হয়। ইফতার ও সাহরির মাঝে অল্প সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার খেতে হয়। এ ছাড়া এ সময় ঐতিহ্যগতভাবে বেশ কিছু খাবার আমাদের খাদ্য তালিকার মাঝে অনুপ্রবেশ করে। এর মাঝে কোনো কোনো খাদ্য রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ হু হু করে বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে ডায়াবেটিস রোগীদের প্রায়ই রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য সৃষ্টি হয়।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইফতারের সময় অতিরিক্ত পরিমাণে ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর পরিমাণ পনেরোশ কিলোক্যালরি ছাড়িয়ে যায়। ফিরনি, হালুয়া, জিলাপি, বুন্দা, দই, মিষ্টিসহ অনেক মিষ্টি জাতীয় ফল ইফতারের খাদ্যতালিকায় থাকে। তা ছাড়া বিভিন্ন ধরনের শরবত তো রয়েছেই। ছোলা, মুড়ি, হালিমসহ আরও কত বাহারি নামের খাবারের প্রাচুর্য ইফতারের সময় লক্ষ্য করা যায়। ভাজাপোড়া খাবারের কথা নাইবা বললাম। ইফতার ও সাহরির মাঝখানেও অনেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণ করে থাকেন। সবকিছু মিলিয়ে এ সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করার ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেরই রোজার সময় স্থূলতা বৃদ্ধি পায়।
সে জন্য রমজানের শুরুতেই খাদ্য পরিকল্পনা করা খুবই প্রয়োজন, বিশেষত ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে। ক্যালরি যাতে কম গ্রহণ করা না হয়, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। কতটুকু কিলোক্যালরি পরিমাণ খাবার গ্রহণ করবেন তা নির্ভর করে অনেক বিষয়ের ওপর। কায়িক পরিশ্রমের ধরন, ডায়াবেটিসের পরিমাণ, শারীরিক গঠন সবকিছুই ক্যালরি গ্রহণের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। একজন সুঠামদেহী পুরুষ এবং নারীর ১৮০০ থেকে ২২০০ কিলোক্যালরি শক্তি প্রয়োজন। উচ্চতা ১৫০ সেন্টিমিটারের কম হলে একজন নারীর পনেরশো কিলোক্যালরি যথেষ্ট। প্রয়োজনবোধে ডায়েটিশিয়ানের সঙ্গে কথা বলে আপনার জন্য কতটুকু কিলোক্যালরি প্রয়োজন সেটি রমজানের পূর্বে ঠিক করে নেওয়া দরকার।
যেসব শর্করা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয় সেসব গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। চিনি, ময়দা, কলে ভাঙানো চাল ইত্যাদি এ পর্যায়ে পড়ে। এসব খাদ্যের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি। তন্তু জাতীয় শর্করা, গোটা শস্য দানা, শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ধীরগতিতে বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ এদের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলক কম। এসব খাবার গ্রহণ করতে কোনো বাধা নেই।
ইফতারের সময় ২-৩টি ছোট খেজুর খাওয়া যেতে পারে। চিনির শরবত পরিহার করা উত্তম। চিনির তৈরি ফিরনি, জিলাপি, হালুয়া, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক নয় মোটেও। ছোলা, মুড়ি, হালিম এগুলো গ্রহণ করতে আপত্তি নেই। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার পাকস্থলীতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। রান্না করার ক্ষেত্রে তেলের ব্যবহার সীমিত করা উচিত। ভোজ্যতেলের মাঝে সূর্যমুখী, জলপাই এবং সবজি জাত তেল ব্যবহার করা স্বাস্থ্যসম্মত। রোজা রেখে অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করতে হবে, যাতে দিনের বেলায় পানিশূন্যতা সৃষ্টি না হয়। চা-কফি ইত্যাদি পান না করাই উত্তম। কারণ এগুলো শরীর থেকে পানি বের করে দেয়। সাহরি দেরিতে খাওয়াই উত্তম। অনেক আগে সাহরি খেলে অথবা সাহরি না খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যেতে পারে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রেখে একজন রোজাদার ডায়াবেটিস রোগী খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করবেন।
