স্বাস্থ্যে চাই বাস্তবসম্মত সমন্বিত পরিকল্পনা

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন বড় রকমের দুর্যোগের মুখে। এই দুর্যোগ মোকাবিলা করে সবার মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা মোটেও সহজ নয়। গ্রাম থেকে শুরু করে শহর পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বিএনপি সরকার বড় বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ থেকে উত্তরণে একটি বাস্তবসম্মত সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসার চেয়ে রোগপ্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আর প্রতিটি জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেনাকাটা, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এই কয়টি ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি আর্থিক দুর্নীতি হয়ে থাকে। বিগত সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতে এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। মন্ত্রী থেকে শুরু করে সচিব এবং নিচে একেবারে পিয়ন পর্যন্ত আর্থিক দুর্নীতির সুবিধাভোগী। কেনাকাটায় লুট হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। খালি বাক্স দিয়েও নিয়েছে কোটি কোটি টাকার বিল। মেশিন না লাগলেও কিনে বাক্সবন্দি ফেলে রাখা হয়েছে স্টোরে। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিতেও মন্ত্রী, নেতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে ‘আঙুল ফুলে কলা গাছ’ হয়েছেন। নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে ভেঙে পড়েছে মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠান বাড়লেও তলানিতে নেমেছে স্বাস্থ্য-শিক্ষার মান। আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সংখ্যক মানুষের দুর্নীতিতে সরকারি পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তারা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে ঠিক মতো সেবা পাচ্ছেন না মানুষ। বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে বেসরকারিতে। মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ সেবা পাচ্ছেন সরকারি পর্যায়ে। বাকি ৮৫ শতাংশের অর্থের বিনিময়ে সেবা নিতে হয় বেসরকারি পর্যায় থেকে। দেশে চিকিৎসায় ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় হয় প্রায় ৭৪ শতাংশ, যা ভুটানে ১৩, ভারতে ৬৩, মালদ্বীপে ২১, নেপালে ৫১, পাকিস্তানে ৫৬ ও শ্রীলঙ্কায় ৫১ শতাংশ। এই ছয়টি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় অনেক বেশি।

কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ডক্টর আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্য মানুষের আয়ু বাড়ানো, কার্যক্ষমতা বাড়ানো, স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে সুখ-শান্তির নিশ্চয়তা। সে জন্য সেবার মান ভালো করা দরকার। কিন্তু আমাদের সেবার মান ভালো না। কাভারেজও ভালো না। যতজনের যে ধরনের সেবা দরকার, তা পান না। কেন পাচ্ছেন না। কারণ পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। যাও আছে, তা সমানুপাতিকভাবে বণ্টিত নয়। সব শহরকেন্দ্রিক। গ্রামে গেলেও থাকে না। মানে ‘কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’। সেখানে ডাক্তার রাখা বড় চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। অপথালমোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট, নেফ্রোলজিস্ট, ডায়াবেটোলজিস্টসহ প্রচলিত রোগের বিশেষজ্ঞ অনেক কম আছে। পেরিফেরিতে তো নেই বললেই চলে। এই সংখ্যা বাড়ানো এবং গ্রামে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। দুর্গম এলাকায় ডাক্তার নার্স রাখতে হলে তাদের বেতন ৩০ থেকে ১০০ শতাংশ বাড়াতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী ডাক্তার নার্স ও প্যারমেডিকের অনুপাত হওয়া দরকার ১:৩:৫। সেখানে ডাক্তার ৯০ হাজার, নার্স ১ লাখের মতো করে আছে। অথচ ডাক্তার ৯০ হাজার থাকলে নার্স ২ লাখ ৭০ হাজার এবং প্যারামেডিক সাড়ে ৪ লাখ থাকার দরকার। সরকারি হিসেবে প্যারামেডিক আছে মাত্র ২০ হাজার।

প্রাথমিক সেবায় সম্পৃক্ত জনবল খুব বেশি প্রশিক্ষিত নয় উল্লেখ করে ডক্টর আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রাথমিক সেবা যদি জোরদার করা যায়, তাহলে সেকেন্ডারি ও টার্সিয়ারিতে চাপ কমে যাবে। ডাক্তারের প্রায় ২০ এবং নার্স প্যারামেডিকের প্রায় ৪০ শতাংশ পদ শূন্য আছে। এগুলো পূরণ করতে হবে। এটা পূরণ হলে, এরা কাভারেজ দেবে। সেবার মান নিশ্চিতে মনিটরিং সুপারভিশন শক্ত করতে হবে। যা আমাদের দেশে নেই।

পদোন্নতিতে বয়স নয়; যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন ডক্টর আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন। তিনি বলেন, যিনি গ্রামে দায়িত্ব পালন করবেন, ভালোভাবে রোগী দেখবেন, সম্মান করবেন, তাকে পদোন্নতি এবং বিদেশে প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সেসরকারি খাতে ভালো করে কেন? তারা বয়স দেখে নয়; দক্ষতা ও সেবার মান দেখে পদোন্নতি দেয়। সরকারিতে এমন লোক বসিয়ে রাখা হয়, তারা যোগ্য নয়। রোগী বেসরকারিতে যেতে বাধ্য হয়। রাজনৈতিক পরিচয়ে আগে পদোন্নতি হতো। এখনো হতে পারে। এটা বন্ধ করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বড় বড় জটিল রোগের সেবা জেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ওপরও জোর দেন। এই সেবা জেলায় নিয়ে যেতে হবে। সেই অনুযায়ী সব করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো স্বাস্থ্যে বাজেট জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ। যা থাকা দরকার ৫ শতাংশ। বার্ষিক ১৫ শতাংশের জায়গায় আছে মাত্র ৫ শতাংশ। বাজেট এত কম, তার সিংহভাগ দুর্নীতিতে চলে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার মান তলানিতে নেমে গেছে। বিগত সরকার যে পরিমাণ ঋণ রেখে গেছে, তাতে হুট করে স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়ানোও বড় চ্যালেঞ্জ।

ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, ‘বিগত সরকার স্বাস্থ্যের সব জায়গাই নষ্ট করে গেছে। এখন আমরা যদি স্বাস্থ্য খাত ঠিক করতে যাই, প্রতিটা জায়গায় হাত দিতে হবে। গ্রাম পর্যায় থেকে শুরু করে শহর পর্যায় পর্যন্ত। মেডিকেল এডুকেশন হচ্ছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। এই ভিত্তি একেবারে নড়বড়ে করে দিয়েছে। মানহীন ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট তৈরি হচ্ছে। যারা আগামীতে স্বাস্থ্যসেবা দেবে, তাদের কোনো মানদ- নেই।’

এভাবে চললে বড় রকমের দুর্যোগ হয়ে যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বড় রকমের ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছে। এটা সামলাতে হলে সব ক্ষেত্রে হাত দিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স, নতুন দেশ গড়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, যাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন, তিনিও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং দেশপ্রেমিক। প্রতিমন্ত্রী তিনি একজন চিকিৎসক এবং চিকিৎসক নেতা। তাদের সঙ্গে আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভব।’

জনস্বাস্থ্যবিদ রাশেদ রাব্বি বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যা, ঘনবসতি ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। যেখানে চিকিৎসার চেয়ে সুস্থতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নীরোগ পরিবেশ গড়ে তুলতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দুটি পরিকল্পনা (একটি স্বল্প ও একটি দীর্ঘমেয়াদি) গ্রহণ করতে হবে। সেটি বাস্তবায়নে আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে উপযুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে দলীয় লেজুড়বৃত্তি পরিহার করে পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। দলীয় বিবেচনায় না নিয়ে উপযুক্ত সব চিকিৎসককে পদোন্নতি প্রদান করতে হবে। চিকিৎসা শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানদন্ডে উন্নীত করতে হবে। পেরিফেরি থেকে টারশিয়ারি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা-কেন্দ্র রোগীর ভারসাম্য বজায় ও সুচিকিৎসা নিশ্চিতে সর্বস্তরে রেফারেল ব্যবস্থা ও ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাক্টিস ব্যবস্থা অবিলম্বে চালু করতে হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ডায়গনস্টিকের সেবা মূল্য নির্ধারণ ও মান নিয়ন্ত্রণে মানদন্ড তৈরি করতে হবে।’

‘বিকেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এক ছাতার নিচে আনতে হবে’ বলে মনে করেন রাশেদ রাব্বি। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় না করে, পৃথক স্বাস্থ্য প্রশাসন ও বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। ২০১১ সালের পরে আর স্বাস্থ্যনীতি হয়নি। কিন্তু সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের জনসংখ্যা, রোগব্যাধি, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে একটি জনমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে। তবে সবকিছুর আগে গত ১৮ মাসে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে স্থবির করে যে লুটপাট চালানো হয়েছে, তার তদন্ত ও বিচার করতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত