হাটে নয়, পথই তার কর্মস্থল। ভোরের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই গরু নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। নির্বাক সঙ্গীটিকে পাশে নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রাম, রাস্তার মোড় থেকে জনবহুল বাজারের আশপাশ এই চলমান পথই যেন তার জীবনের মানচিত্র। সিংগাইর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও রাস্তাঘাটে ভ্রাম্যমাণ গরু ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৪৮ বছর বয়সী আলম বেপারী। তিনি উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়নের কমলনগর গ্রামের সোনামুদ্দিন বেপারীর ছেলে। দীর্ঘদিন হাটকেন্দ্রিক গরুর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বাড়তি খরচ মেটাতে তিনি বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন ভিন্ন এক পথ ভ্রাম্যমাণ গরু ব্যবসা। পুঁজি কম, ঝুঁকি বেশি, তবু থেমে থাকেননি তিনি। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে উপজেলার বিভিন্ন হাট থেকে গরু কিনে নেন আলম বেপারী। এরপর শুরু হয় তার দিনব্যাপী সংগ্রাম। কখনো গ্রামের বিভিন্ন রাস্তার মোড়, দৈনিক সাধারণ হাট-বাজারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন সম্ভাব্য ক্রেতার অপেক্ষায়। পথচারীর চোখে আগ্রহ দেখলেই শুরু হয় দরদাম। কারও পছন্দ হলে সেখানেই সম্পন্ন হয় বিক্রি।
আলম বেপারীর কণ্ঠে নেই অভিযোগ, আছে বাস্তবতার সরল স্বীকারোক্তি ‘সবাই তো হাটে গিয়ে গরু কিনতে পারে না। অনেকেই চান বাড়ির কাছেই গরু দেখতে। আমি সেই সুবিধাটাই দিচ্ছি। লাভ কম হলেও সংসারটা কোনোমতে চলে।’
তার এই উদ্যোগে উপকৃত হচ্ছেন সাধারণ মানুষও। বিশেষ করে বয়স্ক ক্রেতা, নারী কিংবা ব্যস্ত কর্মজীবীরা হাটের ভিড় এড়িয়ে বাড়ির কাছেই গরু কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেকেই তাকে ফোন করে নির্দিষ্ট এলাকায় ডেকে নেন। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছেন পরিচিত ও নির্ভরতার নাম।
স্থানীয়রা জানান, প্রচ- রোদ, টানা বৃষ্টি কিংবা কুয়াশা কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারে না। কখনো দিন শেষে বিক্রি না হলে লোকসান গুনতে হয়। গরু অসুস্থ হলে বাড়ে দুশ্চিন্তা। তবুও জীবনের তাগিদে প্রতিদিন রাস্তায় রাস্তায় গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। কারণ, এই পথই তার পরিবারের ভরসা, সন্তানের পড়ালেখার স্বপ্নের ভিত্তি।
অভাব-অনটন, ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার মাঝেও আলম বেপারীর এই ভ্রাম্যমাণ গরু ব্যবসা কেবল ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয় এটি গ্রামীণ অর্থনীতির এক বাস্তব চিত্র। যেখানে মূলধন কম হলেও পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও টিকে থাকার লড়াই। হাটের বাইরে দাঁড়িয়েও যে বাজার গড়ে ওঠে মানুষের দুয়ারে, পথের ধারে তারই জীবন্ত উদাহরণ আলম বেপারী। পথেই তার হাট, হাতেই তার গরু আর সেই পথেই প্রতিদিন লিখে চলেছেন জীবনের এক অনুচ্চারিত অথচ অনুপ্রেরণাদায়ক।