জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ না কাটতেই শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তোড়জোড়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের বিধি অনুযায়ী গতকালই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নির্বাচিত পর্ষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত একটি ভোটের লড়াইয়ের গোছানো মাঠেই আরেকটি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি ও জামায়াত।
তবে এনসিপি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলদেশ, জাতীয় পার্টি, সিপিবিসহ অন্য দলগুলোতে এখনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম সিটির বর্তমান পর্ষদের নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী আওয়ামী লীগের এম রেজাউল করিম চৌধুরী ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা প্রায় সাড়ে তিন বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামসহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ১ মাস ২১ দিন পর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও চট্টগ্রাম প্রথম যুগ্ম জেলা জজ মো. খাইরুল আমিন এক রায়ে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফল বাতিল করে বিএনপি প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা দেন। এই রায়ের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর থেকে তিনি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন এবং মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
এদিকে আগামী রমজানের পরে চট্টগ্রামসহ দেশের তিনটি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আলোচনা সামনে আসায় রাজনৈতিক দলগুলো এ নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছে। নির্বাচনে বিএনপি থেকে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত ডা. শাহাদাত হোসেনকেই দল প্রার্থী হিসেবে বেছে নেবেন এমনটাই ধারণা করছেন দলের দায়িত্বশীল নেতারা। ইতিমধ্যে ডা. শাহাদাত হেসেন নিজেও আগামী মেয়র নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। মাঠপর্যায়ে তৎপরতা শুরু করেছেন বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সবেমাত্র জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের ভোটের মাঠও গোছানো আছে। এখন নির্বাচনে কে মেয়র প্রার্থী হবেন সেটা দলের হাই কমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে যখন আমাদের মতামত চাইবে আমরা নিজেদের মতামত দেব। দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষে সবাই মিলে কাজ করবে।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নগরীর তিনটি আসনেই অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় আশাতীত ভোট পড়েছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে। নগরীর কোনো আসনে জয় না পেলেও গোছানো ভোটের মাঠকে পুঁজি করে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে চায় জামায়াত। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে তাদের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা সদ্য সম্পন্ন হওয়া সংসদ নির্বাচনেই স্ব স্ব ওয়ার্ডে নিজেদের ভোটের হোমওয়ার্ক করে নিয়েছেন। ইতিমধ্যে মেয়র পদের প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দলের দায়িত্বশীলরা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে আমাদের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। সে অনুযায়ী দলের চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান তৃণমূলের মতামত নিয়ে তিনজনের একটি প্যানেল কেন্দ্রের কাছে পাঠাবেন। এরপর কেন্দ্র থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তিনিই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি। দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি কমরেড শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে নির্বাচনের ঘোষণা আসুক। তারপর আমরা দলীয়ভাবে বসে সিদ্ধান্ত নেব।
২০২১ সালে অনুষ্ঠিত চসিক নির্বাচনে সুন্নিপন্থি দুটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দুটি দল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি মিলে বৃহত্তর সুন্নী জোটের ব্যানারে অংশ নেন। আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা জোট হিসেবে অংশ নেবে কিনা, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিষয়ে নিজেদের দলীয় ফোরামে চলতি সপ্তাহে পৃথক বৈঠক করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান এম ইব্রাহিম আখতারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিগত সময়েও আমরা অংশ নিয়েছি, আগামীতেও আমাদের অংশ গ্রহণ থাকবে। এ নিয়ে চলতি সপ্তাহে আমরা দলের দায়িত্বশীল নিয়ে বৈঠক করব। বৈঠকে যেভাবে সিদ্ধান্ত হবে সেভাবেই আমরা এগিয়ে যাব।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক জোবাইরুল আলম আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের দলের প্রার্থীরা অংশ নেবে। তবে মেয়র কিংবা কাউন্সিলর পদে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে মেয়র পদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মনোনীত ছয়জন ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরা হলেন রেজাউল করিম চৌধুরী (আওয়ামী লীগ), ডা. শাহাদাত হোসেন (বিএনপি), জান্নাতুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), এমএ মতিন (বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট), মুহাম্মদ ওয়াহিদ মুরাদ (ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ), মো. আবুল মনজুর (ন্যাশনাল পিপলস পার্টি) ও খোকন চৌধুরী (স্বতন্ত্র)।
