আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ আর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা ইরান এখন এক অদ্ভুত সংকটে। একদিকে তেলের বাজার ধরে রাখতে মরিয়া তেহরান, অন্যদিকে তেল বিক্রির টাকা নিয়ে চলছে নজিরবিহীন লুণ্ঠন। নিষেধাজ্ঞার চোখ ফাঁকি দিয়ে তেল বিক্রি করতে গিয়ে তৈরি করা একদল রহস্যময় ‘ট্রাস্টি’ বা দালালের মাধ্যমে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা) লোপাট হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশটির বিচার বিভাগ ও সাবেক তেল কর্মকর্তারা এই ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য সামনে এনেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান সরাসরি তেল বিক্রি করতে পারছে না। ফলে তারা সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংস্থাকে ‘ট্রাস্টি’ হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই ট্রাস্টিরা অনানুষ্ঠানিক পথে বিদেশে তেল রপ্তানি করে এবং সেই টাকা দেশে ফেরত আনার কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েক বছরে এই ট্রাস্টিরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তেলের টাকা আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়নি। তারা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নাগরিকদের নাম ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছে এবং শেল কোম্পানির মাধ্যমে সেই টাকা পাচার করেছে।
ইরানের সাবেক তেল কর্মকর্তা আলী আকবর পুর ইব্রাহিম এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, দেশের এই সংকটের সুযোগ নিয়ে একদল দালাল রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ইরানের তেলের টাকায় এই লোকেরা এখন দুবাইয়ের বিলাসবহুল পেন্টহাউসে থাকে এবং রোলস-রয়েস গাড়ি চালায়।’
এমনকি সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তদন্তের নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দেশটির বিচারিক প্রধান গোলাম-হোসনে মোহসেনি-এজেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা অডিট ছাড়াই এই দালালদের হাতে তেল তুলে দিয়েছে, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
যুদ্ধের আশঙ্কায় ইরান সরকার এখন অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা তেল বিক্রির দায়িত্ব দিচ্ছে খাদ্য ও জরুরি পণ্য আমদানিকারকদের হাতে। অর্থাৎ, এই ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছ থেকে তেল নিয়ে বিদেশে বিক্রি করবেন এবং সেই তেলের বদলে বিদেশ থেকে চাল, ডাল বা অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে আসবেন (বার্টার সিস্টেম)। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের তেল ব্যবসার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই, তাদের হাতে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের তেল তুলে দেওয়া দুর্নীতির নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। এটি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য চরম আত্মঘাতী হতে পারে।
এদিকে মার্কিন ড্রোন ও স্যাটেলাইটের নজরদারি এড়াতে ইরান তাদের পুরনো তেলের ট্যাঙ্কারগুলো সস্তায় ‘স্ক্র্যাপ’ বা ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছে। একটি বড় জাহাজ মাত্র ১৪ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, যা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ কম। উদ্দেশ্য হলো, এই টাকা দিয়ে এমন নতুন জাহাজ কেনা যেগুলোর নাম আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নেই। এর ফলে অন্তত এক বছর ধরা না পড়ে গোপনে তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ইরান সরকার।
ইরানের সাধারণ মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা, তখন এই বিশাল অর্থ লোপাট দেশকে আরও সংকটে ফেলেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের তেলবাহী জাহাজ জব্দের চেষ্টা বাড়িয়েছে এবং চীনকেও তেল কেনা বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান হুমকি দিয়েছে যে, যদি তাদের তেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তারা বিশ্ববাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেবে।
সূত্র: আল-জাজিরা
মেক্সিকোর মোস্ট ওয়ান্টেড মাদক সম্রাটের মৃত্যুতে জ্বলছে গোটা দেশ