চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর তিন খাতের কোনোটিতেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতি মাসের হিসাবেও রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি। চলতি অর্থবছরের সাত মাসে সংস্থার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি রয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। গতকাল মঙ্গলবার রাজস্ব সংগ্রহের হালনাগাদ তথ্যবিশ্লেষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
গত অর্থবছর (২০২৪-২৫) প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি রেখে শেষ হয়েছিল। এবারও সেই বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে রাজস্ব আদায়ে মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেই শুরু হয়েছে, নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭ সালের বাজেট কার্যক্রম। ইতিমধ্যে খাতভিত্তিক ব্যবসায়ী সমিতির কাছে বাজেট-সংক্রান্ত মতামত চেয়ে চিঠি দিয়েছে এনবিআর।
জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় এনবিআরকে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়। পরে তা আরও ৫৫ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয় ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে গত সাত মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্র ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ কোটি ৩ লাখ টাকা। এ হিসাবে অর্থবছরের এই সাত মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৬০ হাজার ১২২ কোটি ১১ লাখ টাকা।
এই ঘাটতির মধ্যেও জুলাই-জানুয়ারি সময়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই সাত মাসে ১ লাখ ৯৮ হাজার ১০ কোটি ৯৩ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছিল।
এনবিআরের কর্মকর্তা বলছেন, জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নানা অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথগতি থাকায় রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম হয়েছে।
তবে অর্থবছরের শেষদিকে রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়বে বলে মনে করেন কর্মকর্তারা। তারা মনে করছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সবার মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে অনুকূল পরিবেশ ফিরে আসবে। বিনিয়োগ বাড়বে। এসবের ফলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
তিন খাতেই মন্দা : এনবিআরের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে আয়কর খাতে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে। সাত মাসে ঘাটতি হয়েছে ২৮ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। এই খাতে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৭৫ হাজার ৫৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। তবে এই সাত মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৬৬ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল।
অন্যদিকে আমদানি খাতে সাত মাসে আদায় হয়েছে ৬২ হাজার ৮১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৮ হাজার ৪১৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এই খাতে ঘাটতি হয়েছে ১৫ হাজার ৬০২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে গত অর্থবছরের এ সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৫৮ হাজার ১৮৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা আদায় হয়েছিল।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি ভ্যাট বা মূসক আদায় হয়েছে ৮৫ লাখ ৭৬১ হাজার ৪৫ কোটি টাকা। এ সময়ে এই খাতের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এই সাত মাসে ভ্যাট আদায়ে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে, ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ৭৩ হাজার ৬৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আদায় হয়েছিল।
অর্থবছরের প্রতি মাসেই ঘাটতি : চলতি অর্থবছরের কোনো মাসেই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি এনবিআর। প্রথম মাস জুলাইয়ে লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ১১১ কোটি টাকা; আদায় হয় ২৭ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। ঘাটতি ২ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। এরপর আগস্টে লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। আদায় হয় ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। ঘাটতি ৩ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩৮ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। ঘাটতি হয় ২ হাজার ৩২২ কোটি টাকার ঘাটতি হয়। অক্টোবরে ঘাটতি ৮ হাজার ৩২০ কোটি ৬ লাখ টাকা। এই মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি ৬ লাখ টাকা। আদায় হয় ২৮ কোটি ৪৭৩ কোটি টাকা। নভেম্বর মাসে ৩৬ হাজার ৩২৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে পাওয়া গেছে ২৯ হাজার ২৫৯ টাকা। ঘাটতি ১১ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। ডিসেম্বর মাসে লক্ষ্য ছিল ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি ১২ টাকা। আদায় হয় ৩৬ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। ঘাটতি ছিল ১৫ হাজার ১৭১ কোটি ১২ লাখ টাকা। সবশেষ জানুয়ারি আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা; লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি নিয়ে গত অর্থবছর শেষ হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই এক অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে এমন বিশাল অঙ্কের ঘাটতির মুখে পড়েনি এনবিআর। গণঅভ্যুত্থানের কারণে গত অর্থবছরের প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় অচল ছিল। আবার অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এনবিআরের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সব মিলিয়ে এনবিআরের শুল্ক, ভ্যাট ও কর বিভাগ আদায় করে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। এনবিআরের সংশোধিত লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আয়কর বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৪২ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছিল।
