খামেনি হত্যার শিকার হলে নেতৃত্বে আসবেন লারিজানি

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একদিকে আলোচনার টেবিলে সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার সম্ভাবনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে। ক্রমেই তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের ওপর হামলা বা গুপ্তহত্যা চালানো হলে দেশকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নেবেন জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতাবা খামেনিসহ শীর্ষ মোল্লাদের হত্যার পরিকল্পনা বিবেচনায় রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আলোচনা ভেঙে গেলে শাসক পরিবর্তনের লক্ষ্যে নেতৃত্বে আঘাত হানার বিকল্প সামনে রাখা হয়েছে। চলমান এ উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের সুদা বে নৌঘাঁটিতে এসেছে। বর্তমানে এটি ইরান থেকে মাত্র আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে রয়েছে।

তেহরানের শাসনব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করেছেন খামেনি। সামরিক ও সরকারি উচ্চ পদগুলোর জন্য চার স্তরের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হলে তার পর ধাপে ধাপে কোন চারজন নিয়োগ পাবেন তা আগেভাগেই ঠিক করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বা তিনি নিহত হলে একদল ঘনিষ্ঠ বিশ্বাসভাজনকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। লারিজানি ছাড়াও সম্ভাব্য শীর্ষ নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। আলি লারিজানি ইরানের নিরাপত্তা প্রধান। গত আগস্টে এই নিরাপত্তা প্রধানকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়। মূলত এ কাউন্সিল দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখে।

গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিন ধরে চলা সংঘাতের সময় খামেনি তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নাম ঘোষণা করেছিলেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লারিজানি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে নেই বললে চলে। কারণ, এ পদের জন্য জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেম হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে দেশ পরিচালনার জন্য যারা যোগ্য প্রার্থী, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। এদিকে, অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এখনো ইরানে হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে ইরানি নেতৃত্বকে ‘ডিক্যাপিটেশন ক্যাম্পেইন’-এর মাধ্যমে আঘাত করার পরিকল্পনা তার সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তার ৫৫ বছর বয়সী ছেলে মোজতাবা খামেনি। মোজতাবা খামেনিকে দীর্ঘদিন ধরেই বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হয়। তিনি প্রভাবশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। যুক্তরাষ্ট্র এ বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া মোজতাবা পবিত্র নগরী কোমে ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেছেন, যা সাংবিধানিক ধর্মীয় যোগ্যতার শর্ত পূরণ করে।

হোয়াইট হাউজ সূত্রে জানা গেছে, আলোচনায় সমঝোতা হলে ইরানকে সীমিত বা ‘প্রতীকী’ মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। শর্ত হলো পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ যেন না থাকে। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে নাটকীয় হত্যাকাণ্ডভিত্তিক অভিযানও বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, প্রতিটি পরিস্থিতির জন্য বিকল্প আছে। একটি বিকল্পে আয়াতুল্লাহ, তার ছেলে ও মোল্লাদের সরিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিমান হামলার কথা বিবেচনা করছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশটির শিক্ষার্থীরা তৃতীয় দিনের মতো কর্র্তৃপক্ষকে অগ্রাহ্য করে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানি কর্র্তৃপক্ষ দেশ জুড়ে চলা ব্যাপক অস্থিরতা রক্তপাতের মধ্য দিয়ে দমন করেছে। ওই সময় কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা পরপর তিন দিন ধরে রাস্তায় নামছে। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত সোমবার তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় ও নারীদের আল-জাহরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল করে সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছে, পতাকা পুড়িয়েছে। আমির কবির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারবিরোধী প্রতিবাদের সময় হাতাহাতিতে জড়িয়েছে। এ তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ই রাজধানী তেহরানে অবস্থিত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইতিমধ্যেই তার ৩৬ বছরের মেয়াদের মধ্যে সবচেয়ে গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে দেশটিতে বাড়তে থাকা অস্থিরতা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের রূপ নিচ্ছে, জানুয়ারিতে যার সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত