সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের পরমাণু আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে মধ্যস্থতাকারী ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি দাবি করেছেন। তবে যুদ্ধ এড়াতে পারে এমন কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ওমানি মন্ত্রী বলেন, দুই পক্ষ নিজ নিজ রাজধানীতে পরামর্শ করে আবার আলোচনায় বসার পরিকল্পনা করেছে। আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, যিনি ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, আলোচনাকে ‘সবচেয়ে তীব্র’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, কিছু বিষয়ে ভালো অগ্রগতি হয়েছে এবং কয়েকটি মূল উপাদান নিয়ে সমঝোতা হয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে।
আরাগচি বলেন, পরবর্তী বৈঠক এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে হবে।
এই আলোচনা চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে। দুটি বিমানবাহী রণতরীসহ অসংখ্য যুদ্ধবিমান, জাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম ইরানের আশপাশে মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সীমিত হামলা চালাতে পারে, যা আরও বড় সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে আরও আলোচনার সম্ভাবনা যুদ্ধের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের কাছে এখন যে পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে (প্রায় ৪০০ কেজি), তা দিয়ে খুব অল্প সময়ে অস্ত্র-গ্রেড উপাদান তৈরি করা সম্ভব।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি অর্জনের অধিকারের ওপর জোর দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা ও মজুদ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ৩-৫ বছরের জন্য সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রেখে পরে ন্যূনতম মাত্রায় (যেমন ১.৫ শতাংশ) এটি চালু রাখার প্রস্তাব দিয়েছে।
বিনিময়ে ইরান দীর্ঘমেয়াদি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
গত বৃহস্পতিবার ওমানি রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে দুই পর্বে এই পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে সকালের অধিবেশন প্রায় তিন ঘণ্টা এবং সন্ধ্যার অধিবেশন সংক্ষিপ্ত।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার। আলোচনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও উপস্থিত ছিলেন।
ইরান আগেই স্পষ্ট করেছে যে, তারা শুধু পরমাণু কর্মসূচি নিয়েই আলোচনা করবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি গ্রুপগুলো নিয়ে নয়।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সামরিক প্রস্তুতি ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে সীমিত হামলা বা দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ চেয়ারম্যানসহ মিত্র দেশগুলো সতর্ক করেছে যে, এমন হামলা অঞ্চলে ব্যাপক যুদ্ধের সূচনা করতে পারে এবং শাসক পরিবর্তন করা সহজ হবে না। আলোচনা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে, তবে চূড়ান্ত সমাধান এখনো অনিশ্চিত।
