ভূমিকম্পে ভাবনা বাড়াচ্ছে শাখা ফল্ট। দেশের অভ্যন্তরে থাকা ছয়টি প্রধান ফল্ট লাইন বা ফাটল রেখার আওতাধীন শাখা ফল্টেই বিক্ষিপ্তভাবে ভূমিকম্পের উৎপত্তি ঘটছে। আর নতুন নতুন জায়গায় এসব ভূমিকম্প হওয়ার কারণে তা নিয়ে ভূ-কম্পনবিদদের জানার পরিধিও কম। নতুন গবেষণা ছাড়া সঠিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা।
সাম্প্রতিক সময়ে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায় গত শুক্রবার ৫ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হলেও অতীতে এই এলাকায় এমন মাত্রার কোনো ভূমিকম্প হয়নি। উপাত্তে দেখা যায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলোরোয়াতে ৪ দশমিক ১ রিখটার স্কেলের, গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর যশোরের মনিরামপুরে ৩ দশমিক ৫ এবং ২০২২ সালের ৩ এপ্রিল যশোরের চৌগাছায় ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। কিন্তু এই এলাকার পাশ দিয়ে কোনো ফল্ট লাইন বা ফাটল রেখা যায়নি। শুধু কি এই এলাকা?
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ৪ দশমিক ৪ এবং ঝিনাইদাহের কালিগঞ্জে ২৬ ফেব্রুয়ারি ৩ দশমিক ২ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছে। এই এলাকায়ও কিন্তু ফল্ট লাইন নেই। এ ছাড়া গত ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় ৩ দশমিক ২, ২৫ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের আটঘরিয়া বাজার এলাকায় ৩ দশমিক ৪, নরসিংদীতে গত ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের যে ভূমিকম্পে ঢাকা শহর কেঁপে উঠেছিল সেই এলাকায়ও কিন্তু কোনো ফল্ট লাইন নেই। নরসিংদী ভূমিকম্পের পর ঢাকার বাড্ডায় ২২ নভেম্বর ৩ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলসহ আরও অনেক এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে ভূমিকম্প হয়েছে। এসব ভূমিকম্পের কোনোটি কিন্তু ফল্ট লাইন বরাবর হয়নি।
ফল্ট লাইন ছাড়া কি ভূমিকম্প হয় না?
সাম্প্রতিক সময়ে গত তিন মাসে ২০ দফা ভূমিকম্পের প্রায় সবগুলোই হয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে। আর সব ভূমিকম্প মৃদু ও মাঝারি মাত্রার। এসব ভূমিকম্পের উৎপত্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভূমিকম্পের জোনিং ম্যাপ তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. তাহমিদ আল হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব ভূমিকম্প বিক্ষিপ্তভাবে হচ্ছে। এগুলো আমাদের যে নির্ধারিত ফল্ট লাইন রয়েছে সেসব ফল্ট লাইনের মধ্যে নয়। তার মানে এই নয় যে নতুন ফল্ট লাইন হতে পারবে না। হয়তো নতুন কোনো ফল্ট লাইন হয়েছে যা আমাদের গবেষণার বাইরে। এখন গবেষণা করে এসব ফল্ট লাইন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
তবে অপর এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো আমাদের বেইজমেন্ট (পলি মাটির নিচের স্তরে) উৎপত্তি লাভ করছে। তার মানে হলো এগুলো ছোট কোনো ফল্টে হচ্ছে। আর এসব ছোট ফল্টগুলো বড় কোনো ফল্টের অংশও হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মাটির নিচে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার যেকেনো ভূমিকম্প অবশ্যই কোনো না কোনো ফল্টের মাধ্যমে শক্তি বের করে দিচ্ছে। তাই ছোট এসব ফল্টগুলো সম্পর্কে আমাদের আরও অনেক গবেষণা করা প্রয়োজন।
ছোট ফল্টগুলোই কি শাখা ফল্ট?
আমাদের দেশে প্রধানত তিনটি টেকটোনিক প্লেট (ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা) এবং ৬টি প্রধান ফল্ট লাইন বা ফাটল রেখা রয়েছে। এই ছয়টি ফল্ট লাইন হলো ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, সিলেট ফল্ট, মেগা থ্রাস্ট ফল্ট, ইন্ডিয়ান বার্মা প্লেট বাউন্ডারি, চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ফল্ট। বর্তমানে দেশে বিক্ষিপ্তভাবে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলো এসব প্রধান ফল্ট লাইনের বাইরে। নরসিংদীর ভূমিকম্পও কিন্তু এসব ফল্টের আওতায় পড়েনি। এ বিষয়ে বর্তমানে আমেরিকায় পিএইচডি গবেষণারত ও বাংলাদেশ জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের উপ-পরিচালক (ভূ-তত্ত্ব) আখতারুল আহসান বলেন, প্রধান ফল্ট লাইনগুলোর অনেকগুলো শাখা ফল্ট রয়েছে। বর্তমানে বিক্ষিপ্তভাবে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলো অবশ্যই শাখা ফল্টে রয়েছে। ফল্ট ছাড়া ভূমিকম্প উৎপত্তি হতে পারে না। দেশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শাখা ফল্টগুলোর মাধ্যমে প্রধান ফল্টের শক্তি বের হয়ে আসছে।
একই মন্তব্য করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশিষ্ট ভূমিকম্পবিদ মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিক্ষিপ্তভাবে ভূমিকম্পগুলো উৎপত্তি লাভ করলেও এগুলো কোনো না কোনো ছোট ফল্টে হচ্ছে। হয়তো এসব ফল্ট আমাদের অজ্ঞাতে রয়েছে। আর এসব ছোট ফল্টে এমন ভূমিকম্পের কারণে মাটির অভ্যন্তরের শক্তিগুলো বের হয়ে আসছে। এতে হয়তো আগামীতে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে।
এর আগে গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পের উৎসস্থল নিয়ে গবেষণা করেছেন প্রফেসর ড. জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, সেখানে আমরা প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ফল্ট লাইন পেয়েছিলাম। এই ফল্টে ৭ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। সারা দেশে এমন ছোট ছোট অনেক ফল্ট থাকতে পারে। আর এসব ছোট ফল্টেই ভূমিকম্পগুলোর উৎপত্তি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তবে দেশের ভেতরে সক্রিয় যেসব ফল্ট লাইন রয়েছে সেগুলোতে ৭ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পও কিন্তু হতে পারে। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কিন্তু এই তথ্যই পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, সারা বিশ্বে প্রতিবছর দুই হাজার বার ভূমিকম্প হয়। এদের মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। ছোট-বড় ২৭টি প্লেট নিয়ে গঠিত পৃথিবী প্রতিনিয়ত গতিতে থাকার কারণে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। ইন্ডিয়া ও বার্মা প্লেটের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণেই টেকনাফ থেকে নেপাল পর্যন্ত হিমালয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত গঠিত হয়েছিল। দেশে ২০২১ থেকে এ পর্যন্ত ১৭৯টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। এরমধ্যে ৬৩টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে এবং এগুলোর মধ্যে গত ১৪ মাসে হয়েছে ৩২টি। এসব ভূমিকম্পের প্রায় সবগুলোই মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছে।
