কার যুদ্ধে কে জেতে কে হাসে

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০২:১১ এএম

বাতকে বাত বলা হয়ে থাকে- যুদ্ধে যারা যায়, তারা যুদ্ধ চায় না। যারা চায়, তারা যুদ্ধে যায় না। আসলে যুদ্ধ বা হামলা শুরু হয়ে গেলে তখন কে কী বলল, তাতে যুদ্ধবাজের কিচ্ছু যায় আসে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলে রেখেছিলেন, ইরান কথা মতো না চললে যুক্তরাষ্ট্র এমন হামলা করবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ঠিকই ঘটনা ঘটিয়ে দিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের প্রথম প্রাইমারিগুলোর তিন দিন আগে, ইরানে হামলা চালায় ট্রাম্প প্রশাসন। আগামী দুই বছরের জন্য ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে কি না, তা নির্ধারণ করবে এ নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে গোষ্ঠীসুদ্ধ হত্যার ঘটনাকে ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার গুরুতর লঙ্ঘন বা জাতিসংঘ সনদের নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নিয়মের পরিপন্থী বলে যত গাল দেওয়াই হোক, ট্রাম্প আপাতত থামছেন না, তা পরিষ্কার। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি কেবল ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বই দেননি, রাষ্ট্রটির চেহারাও ঠিক করে দিয়েছিলেন। হামলার জবাবে তেহরান দৃশ্যত চারদিকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য এক নজিরবিহীন অস্থিরতার মুখে পড়েছে। চলমান এই ঝড়ের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের সাধারণ মানুষ। গত ডিসেম্বরে হাজার হাজার ইরানি রাস্তায় নেমে আসেন। সরকার কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। বিক্ষোভের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ‘সাহায্য আসছ’ বলে। তবে খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের জনগণের ভবিষ্যৎ এখন আরও বেশি বিপজ্জনকভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ইরানে হামলার বিষয়কে শুরুতে ভাবা হয়েছিল, গতানুগতিক হুমকি-ধমকি। অথবা ভয় দেখানো, যেমনটি ট্রাম্প করে থাকেন। নরম-গরম কত কথাই তো বলেন তিনি। ইরানে হামলা প্রশ্নে, মধ্যমেয়াদি নির্বাচনের প্রথম প্রাইমারিগুলোর তিন দিন আগে ট্রাম্প  দেখিয়ে দিলেন গোটা বিশ্বকে। দিলেন কাঁপিয়েও। খোদ তার নিজ দেশের মানুষ অপছন্দ করলেও। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সায় নেই দেশটির নাগরিকদের। প্রতি চারজনের মধ্যে মাত্র একজন মার্কিনি মনে করেন, ইরানে হামলা ঠিক হয়েছে। এ তথ্য উঠে এসেছে, ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের জরিপে। জরিপের ফলাফলে সংবাদ সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রতি চার মার্কিনির যে একজন ইরানের নেতা হত্যাকারী মার্কিন হামলাকে সমর্থন জানিয়েছে, তার প্রায় অর্ধেক রিপাবলিকান। আর চারজন রিপাবলিকানের মধ্যে একজন বিশ্বাস করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ঠিক করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ২৭ শতাংশ মার্কিনি হামলার পক্ষে রয়েছে। আর ৪৩ শতাংশ বিপক্ষে। আর কোনো দিকে যাননি ২৯ শতাংশ। প্রতি ১০ জনের ৯ জন উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা শনিবার সকালে শুরু হওয়া হামলার বিষয়ে অন্তত কিছুটা শুনেছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে ১ মার্চ পর্যন্ত জরিপটি চালায় রয়টার্স। এতে অংশ নেয় এক হাজার ২৮২ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিনি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভেনেজুয়েলা, সিরিয়া ও নাইজেরিয়ায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব হামলার নির্দেশ দিয়েছেন বলে মনে করেন ৫৬ শতাংশ মার্কিনি। এর মধ্যে রয়েছে ৮৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাট, ২৩ শতাংশ রিপাবলিকান এবং ৬০ শতাংশ নন-পলিটিক্যাল মার্কিনি। ইরানে হামলা নিয়ে নিজ দলের সমর্থকদের কাছে ভালো অবস্থানে নেই  ট্রাম্প। ৫৫ শতাংশ রিপাবলিকান ট্রাম্পের পক্ষে থাকলেও, ১৩ শতাংশ রয়েছে বিপক্ষে। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া ৪২ শতাংশ রিপাবলিকানের মতে, ইরান অভিযানে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা নিহত বা আহত হয়, তবে জনগণের সেই অভিযানকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম।

ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অনুমোদনের রেটিং সামান্য কমে ৩৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ১৮-২৩ ফেব্রুয়ারি পরিচালিত জরিপের চেয়ে এক শতাংশ কম। রয়টার্সের জরিপগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখিয়েছে, ভোটারদের শীর্ষ উদ্বেগ হলো অর্থনীতি নিয়ে। দূরের সেই যুদ্ধ কেবল দূরের জন্য নয়, কাছে-কিনারে সবার জন্যই উদ্বেগের। বাদ নেই বাংলাদেশও। আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় সবসময় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার শিকার দেশটি। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার শঙ্কা ভর করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানে নতুন শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে কাজ না করায় বাংলাদেশে এখন মূলত জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে তা তেলের দাম, এলপিজি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির সরবরাহের ওপর অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যই বাংলাদেশের প্রধান আমদানি উৎস। এই যুদ্ধ চলতে থাকলে দেশের জন্য জ্বালানির দাম ও সরবরাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। বাড়তি চাপ তৈরি হবে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও রিজার্ভের ওপর। এশিয়া ও ইউরোপ এবং আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর প্রধান নৌপথ সুয়েজ খাল ইরানের খুব কাছাকাছি। সেখানে এই যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হবে। এরই মধ্যে হুতি হামলার কারণে লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে পোশাক রপ্তানিকারকদের মহাযন্ত্রণায় পড়তে হবে। এর আগে বাংলাদেশি পোশাক ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, কিন্তু সেই যুদ্ধ চার বছর ধরে চলমান। পাকিস্তানও এরইমধ্যে আক্রান্ত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষে পাকিস্তানে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। রবিবার করাচিতে শত শত বিক্ষোভকারী মার্কিন কনস্যুলেটে প্রবেশের চেষ্টা করলে, পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পাকিস্তানের উত্তরের শহর গিলগিটে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৭ জন নিহত এবং বহু আহত হয়েছে। বিশ্বের কে কোথায় আক্রান্ত হলো, ঘটনাকে যে যেভাবেই দেখুক  তা ভাবার সময় নেই ট্রাম্পের। তার মতে, খামেনির মৃত্যু ইরানিদের জন্য ‘নিজেদের দেশ ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ’। গত জুনে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শেষ ধাপের হামলার পর থেকে প্রকৃত ক্ষমতা মূলত ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ এবং ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি)’ হাতে চলে গেছে। ফলে এই যৌথ অভিযান শেষ হওয়ার পর ইরানে একটি দুর্বল ও ক্ষতবিক্ষত কিন্তু অত্যন্ত ক্ষুব্ধ শাসনব্যবস্থা থেকে যেতে পারে। তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে এবং ট্রাম্পের উসকানিতে সাড়া দেওয়ার সাহস দেখালে সাধারণ মানুষকে দমনে আরও মরিয়া হয়ে উঠতে পারে।

বিক্ষোভ দমনে রক্তক্ষয়ী অভিযানের কারণে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়া এবং কোনো সুনির্দিষ্ট নেতা বা বিকল্প নেতৃত্ব না থাকাটাও বড় প্রতিকূলতা। যদিও কোনো কোনো বিক্ষোভকারী ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর ছেলে রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবি তুলেছিলেন। ওই বিপ্লবের মাধ্যমেই বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সূচনা। এমনকি ইরানি কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মতো যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই হামলার সমর্থক, তারাও এখন উদ্বিগ্ন। দেশটিতে তাদের হাতেগোনা কিছু সংগঠিত সশস্ত্র বিরোধী শক্তি রয়েছে। তবে, তারা রাজতন্ত্র ফেরার পক্ষে নয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান চলে। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া তথ্য ও নিজেদের গোয়েন্দা তথ্য মিলিয়ে কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করে এই হামলা চালায়। লক্ষ্য ছিল, ইরানের শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করে হত্যা করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তার আগে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইএ বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য পায়। সংস্থাটি কয়েক মাস ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনির অবস্থান ও চলাফেরা নজরে রেখেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা তার অবস্থান ও অভ্যাস সম্পর্কে আরও নিশ্চিত তথ্য সংগ্রহ করে। সিআইএ জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একটি কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক হবে। সেই বৈঠকে খামেনিও উপস্থিত থাকবেন।

সিআইএ এই তথ্য পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলার সময় বদলে ফেলে। দ্রুত বড় ধরনের সাফল্য মেলে। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করেছে, যুদ্ধের প্রস্তুতির স্পষ্ট সংকেত থাকার পরও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের সুরক্ষায় যথেষ্ট সতর্ক ছিলেন না। সেই সঙ্গে মিলছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত। এর আগে  একাধিকবার ইরান-ইসরায়েল তথা ইরান-আমেরিকা সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর নানা শঙ্কা তৈরি হলেও, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধটি পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে গড়ায়নি। রাশিয়া ও চীনের মতো পরাক্রমশালী দেশগুলো এই যুদ্ধে জড়ায়নি। কিন্তু খামেনি হত্যা পুরো দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। কেউই নিরাপদ বা স্বস্তির জায়গায় নেই। ইরানে হামলার জবাবে, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে তেহরান। গত বছরের ১৩ জুন ইরানের ওপর ইসরায়েলের আকস্মিক বিমান হামলার ঘটনায়ও এই প্রশ্নটি সামনে এসেছিল যে, এই যুদ্ধ কি আদৌ বিশ্বযুদ্ধের দিকে যেতে পারে? ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলা এবং তার পাল্টা জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ এই দুইয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়, তার পরিণতি আসলে কী হবে? তখন যুদ্ধটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিশ্বযুদ্ধের মতো শঙ্কা ভর করেনি। এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। ইসরায়েল ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ইরানিদের কলিজায় আঘাত করেছে। শেষ পর্যন্ত আলোচনা ও সমঝোতার পথ এড়িয়ে উভয়পক্ষ যুদ্ধে অটল থাকলে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হোক মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ইউক্রেন তৈরির সমূহ লক্ষণ স্পষ্ট।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত