ঈদে ১৫০ কোটি টাকার জামদানি বিক্রির আশা

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৮:০৩ এএম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়া বিসিক জামদানিপল্লীতে ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে তাঁতিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। পল্লীর ভেতরের রাস্তাগুলোর বেহাল দশা হলেও তাঁতঘরে চলছে অবিরাম খটখট শব্দ। তাঁতিরা নানা নকশার জামদানি শাড়ি বুনছেন দিন-রাত। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে শাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রায় ৩০ কোটি টাকার জামদানি ভারত, ভুটান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে বলে তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এবার ঈদে তারা ১৫০ কোটি টাকার জামদানি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন।

এদিকে জামদানি বিক্রির লাভে তাঁতকলের মালিকরা কোটিপতি হলেও তাঁতিদের ভাগ্যের চাকা ঘুরেনি। জামদানির মূল্য ও লাভ বাড়লেও তুলনামূলকভাবে বাড়েনি তাঁতিদের পারিশ্রমিক। ফলে অনেক তাঁতি পেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। কয়েক বছর আগে এখানে প্রায় ৫ হাজার তাঁতি ছিলেন, বর্তমানে সাড়ে ৩ হাজারের মতো।

জামদানি বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর ইতিহাস কয়েকশ বছরের। মসলিনের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত এ শিল্পের জনপ্রিয় নকশার মধ্যে রয়েছে পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খি, বটতলপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, দুবলী, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার, কলকাপাড় ইত্যাদি।

পল্লীতে প্রায় ৩০টি শোরুম রয়েছে, যেখানে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতার ভিড় লক্ষণীয়। আগে শুধু শাড়ি তৈরি হলেও এখন জামদানি দিয়ে পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, টুপি ও শিশুদের পোশাকও তৈরি হচ্ছে। এতে জামদানির জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

তাঁতিরা জানান, ৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা মূল্যের জামদানি তৈরি করেন তারা। একেকটি শাড়ি তৈরিতে ১৫ দিন থেকে ২ মাস লাগে, পারিশ্রমিক পান ১০-২০ হাজার টাকা। এ অবস্থায় অনেকে পেশা ছাড়ছেন। বেশিরভাগ তাঁতি এখনো ঈদের কেনাকাটা করেননি, আশা করছেন ঈদের আগে বিল পেয়ে কেনাকাটা করবেন।

অনলাইন বিক্রিও জমে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক) ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে তাঁতি ও দোকানিরা পেজ খুলে শাড়ির ছবি ও দাম দিয়ে অর্ডার নিচ্ছেন। কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। একেকটি শাড়ি ২ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। অনলাইন মিলিয়ে এবার ৮০ কোটি টাকার বিক্রির টার্গেট রয়েছে বলে কেউ কেউ জানিয়েছেন।

শফিকুল ইসলাম (শফিকুল জামদানি মালিক) বলেন, ‘দেশের নামিদামি ব্র্যান্ডে জামদানি সরবরাহ করছি। সুতার দাম বাড়ায় ব্যবসা আগের মতো নেই। আমার কারখানায় আমেরিকান হাইকমিশনারসহ বিদেশিরা পরিদর্শন করেছেন। জামদানি বাঁচাতে সরকারের আরও সহযোগিতা দরকার।’

আসিফ মাহমুদ (বিসমিল্লাহ জামদানি মালিক) জানান, গত কয়েক বছর বাজার খারাপ ছিল, এবার চাঙ্গা হয়েছে। অনলাইনে ভালো বিক্রি হচ্ছে। তাঁতিদের পারিশ্রমিক বাড়ানো হয়েছে, তবে সুতার দাম বেশি হওয়ায় আরও বাড়ানো যাচ্ছে না।

আরিফুল ইসলাম কাশেম (জামদানি ব্যবসায়ী) বলেন, ‘ভারতে জামদানি রপ্তানি করি। সেখানে আমাদের জামদানির কদর অনেক। মেলায় অংশ নিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরি।’

তাঁতি আহাদ বলেন, ‘১০ বছর ধরে শাড়ি বুনছি। সপ্তাহে ৩ হাজার টাকা, মাসে ১২ হাজারের মতো পাই। এ টাকায় সংসার চালাতে কষ্ট হয়।’

তাঁতি ইমরান হোসেন ও স্ত্রী সালমা বেগম ১২ বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করেন। দুজনে মিলে মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন। দুই সন্তানের লেখাপড়া চালাতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

বিসিক জামদানি পল্লীর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারিভাবে তাঁতিদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। ঈদে ১৫০ কোটি টাকার বিক্রির টার্গেট রয়েছে। তাঁতিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে আমরা কাজ করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত