নারী দিবস এলেই আমরা নানা আয়োজন করি, সেমিনার, আলোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য পোস্ট। তবে এই উদযাপনগুলো কি সত্যিই সমাজে কোনো গভীর পরিবর্তন আনতে পারছে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যায় বলছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করা পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার।
তিনি মনে করেন, পরিবর্তন হয়তো খুব দ্রুত বা গভীরভাবে আসে না। কিন্তু তবুও এই আলোচনা, এই উদযাপনের একটা প্রয়োজন আছে। কারণ বাহ্যিক পরিবর্তনও ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরের ভাবনাকে প্রভাবিত করে। তাই নারী দিবসের কথাবার্তা, প্রশ্ন তোলা এসবকে তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করেন না। এই কথাগুলো বলার পেছনে আছে তার নিজের দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া নিশাত মজুমদার ছোটবেলা থেকেই পাহাড় আর অভিযানের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতেন। ধীরে ধীরে সেই আগ্রহই তাকে নিয়ে যায় পর্বতারোহণের জগতে। ২০১২ সালের ১৯ মে তিনি ইতিহাস তৈরি করেন, বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে বাংলাদেশের পতাকা তুলে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রথম নারী এভারেস্ট বিজয়ী।
এভারেস্টের আগে তিনি হিমালয়ের একাধিক কঠিন শৃঙ্গেও আরোহণ করেছেন, যেমন মেরা পিক, সিংচুলি পিকসহ ৬ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার কয়েকটি পর্বত। পেশাগতভাবে তিনি ঢাকার ওয়াসায় হিসাব বিভাগে কাজ করলেও তার পরিচয়ের বড় অংশ জুড়ে আছে অভিযাত্রা, তরুণদের অনুপ্রেরণা দেওয়া এবং আউটডোর কার্যক্রমের প্রচার। কিন্তু এত অর্জনের পরও নিশাত মনে করেন, মেয়েদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা এখনো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি।
অ্যাডভেঞ্চার, স্পোর্টসের মতো ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম। এর পেছনে বড় কারণ সামাজিকভাবে মেয়েদের আগলে রাখার প্রবণতা। আমরা কি সত্যিই একজন নারীকে সেই জায়গায় দেখতে চাই? নাকি অজান্তেই তাকে থামিয়ে দিই? তিনি মনে করিয়ে দেন, আমাদের সমাজে এখনো মেয়েদের খেলাধুলা নিয়ে নানা আপত্তি শোনা যায়, বিশেষ করে পোশাক নিয়ে। কোথাও মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধ করার চেষ্টা হয়, কোথাও আবার বলা হয় ‘ভালো মেয়েরা’ এ ধরনের খেলাধুলা করে না। এই ‘ভালো মেয়ে’ ধারণাটাই আসলে বড় সমস্যা বলে মনে করেন নিশাত।
তার ভাষায়, ‘আমি তো একই সঙ্গে ভালো মেয়েও হতে চাই, আবার খেলতেও চাই। তাহলে আমি কী করব? সমস্যাটা এখানে যে সমাজ একটি নির্দিষ্ট ইমেজ বানিয়ে দিয়েছে। ভালো মেয়ে মানে কেমন হবে, কী পোশাক পরবে, কোথায় যাবে, কী করবে। অথচ ভালো মানুষ হওয়ার আসল মানদ- তো অন্য কিছু। একজন মানুষ সত্য কথা বলে কিনা, সৎ পথে চলে কিনা, অন্যের উপকার করে কিনা এসবই তো ভালো হওয়ার আসল মাপকাঠি। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক সময় ভালো-খারাপের বিচার হয়ে যায় পোশাক বা বাহ্যিক আচরণ দিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলানো না গেলে নারীর অগ্রগতিও আটকে থাকবে, এমনটাই মনে করেন তিনি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও এই কথারই প্রমাণ। খেলতে চাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। কারণ আউটডোর স্পোর্টস, বিশেষ ধরনের পোশাক এসবকে অনেকেই ‘ভালো মেয়েদের জন্য নয়’ বলে মনে করে। কিন্তু স্বপ্ন তো সমাজের তৈরি সীমানা মানে না।
তাই যারা গতানুগতিক ধারার বাইরে কোনো পেশা বা ক্ষেত্র, যেমন অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস বেছে নিতে চায়, তাদের জন্য নিশাতের পরামর্শ খুব সরল কিন্তু শক্তিশালী, নিজেকে মানসিকভাবে শক্ত করতে হবে। কারণ এই পথে হাঁটতে গেলে অনেক সময় চারপাশ থেকে চোখরাঙানি আসবে। প্রশ্ন উঠবে, সমালোচনা হবে, নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা হবে। সেই সবকিছুকে উপেক্ষা করে নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটার সাহসটাই সবচেয়ে জরুরি। নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজেই নিতে হবে, নিজের স্বপ্নকেও নিজেকেই উদযাপন করতে হবে।
নারী দিবসে তাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ ফুল দেওয়া বা শুভেচ্ছা জানানো নয়। বরং আমাদের চিন্তার জায়গাটাকে একটু প্রশ্ন করা, আমরা কি সত্যিই মেয়েদের তাদের স্বপ্নের জায়গায় দেখতে প্রস্তুত?
