রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, ঘরে-বাইরে উভয় স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে নারীর উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য গৃহীত নীতিমালার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৬’ উদযাপন এবং ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক নারী ও কন্যারা যেন আর অবহেলা, নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার না হন। তারা যেন সমান সুযোগ ও মর্যাদা পান।
বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি জানান যে, তিনি এমন এক দেশের স্বপ্ন দেখেন যেখানে প্রতিটি নারী নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠবে, স্বাবলম্বী হবে এবং নেতৃত্ব দেবে। যেখানে প্রতিটি কন্যাশিশু স্বপ্ন দেখবে এবং সেই স্বপ্নপূরণের অফুরন্ত সুযোগ পাবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ডা. জুবাইদা রহমান এবং তাদের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘গণতন্ত্রের অগ্রগতিতে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান তার দাদির পক্ষে এই পুরস্কার গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় এখনো বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, নারীর অগ্রগতি দেশ ও জাতির অগ্রগতি। বিশেষ করে পুরুষশাসিত সমাজে এই সত্যকে স্বীকৃতি দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথা উল্লেখ করে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, নারী উন্নয়নের জন্য তিনি যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তা বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী ও সময়োপযোগী রূপ নেয়। তিনি মেয়েদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা চালু করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, নারীশিক্ষার হার বাড়াতে বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তিও চালু করেন। এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সরকার স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ চালু করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোকে সহায়তা করার লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি জানান, এটি আগামী ১০ মার্চ থেকে চালু হবে। আশা করা হচ্ছে, উদ্যোগটি পারিবারিক অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
রাষ্ট্রপতি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা; কর্মক্ষেত্রে ও মজুরি বৈষম্য; দুর্বল আইনি সুরক্ষা; নিরাপত্তাহীনতা; বাল্যবিবাহ; নারীবিরোধী মনোভাব এবং সামাজিক কুসংস্কারসহ বেশ কয়েকটি স্থায়ী সামাজিক চ্যালেঞ্জও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সামাজিক হয়রানির পাশাপাশি অনলাইনে নারীর চরিত্র হনন ও সাইবার বুলিং অপরাধের নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং বৃহত্তর সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এসব সমস্যা মোকাবিলার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
তিনি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী এবং তরুণ প্রজন্মকে নারীর প্রতি সমতা ও শ্রদ্ধার মূল্যবোধ প্রচারের কথাও বলেন।
তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত লাখ লাখ নারীর অবদানের কথা স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। তাদের দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবেও বর্ণনা করেন। রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, রাজনীতি, গণমাধ্যম, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, শান্তিরক্ষা এবং ক্রীড়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা বর্তমানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করছে।
বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের সব আন্দোলন ও সংগ্রামের শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি শ্রদ্ধা জানান। অনুষ্ঠানে ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীকালের ন্যায়বিচার : নারী ও মেয়েদের অধিকার সুরক্ষিত থাকুক’ শীর্ষক তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পাঁচটি ভিন্ন বিভাগে আরও পাঁচ নারীকে সম্মাননা পদক প্রদান করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
এদিকে, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করা হয়েছে। র্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নারী অধিকার, মর্যাদা ও সমতার বার্তা তুলে ধরা হয়।
নারীর ক্ষমতায়ন, সমতা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, সেই লক্ষ্য সামনে রেখে মেয়েদের জন্য অবৈতনিক স্নাতকোত্তর শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি অনলাইনে হয়রানি, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অ্যাসিড নিক্ষেপ এবং নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গতকাল রবিবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রেস ক্লাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
শামা ওবায়েদ বলেন, আমি সরকারের অংশ হতে পারি, কিন্তু আমার বড় পরিচয় আমি একজন মা, একজন মেয়ে, একজন নারী। আমি আমার অবস্থান থেকে চাইব, একজন ধর্ষক সে যে-ই হোক, তাকে বাংলাদেশের আইনে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।
নারীদের সমস্যা তাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারের প্রতিপাদ্য নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এ সময় তিনি সদ্য প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। নারীশিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার আদর্শকে তিনি গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন।
দিবসটি উপলক্ষে নারী অধিকার, মর্যাদা ও সমতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে পথনাটকের আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদ। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে মঞ্চস্থ হয় পথনাটক ‘শিকল ভাঙার গান’। সাম্প্রতিককালে দেশে নারীদের প্রতি ঘটে যাওয়া খুন, ধর্ষণ, সহিংসতা এবং মানবিক মূল্যবোধের ক্রমাগত অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে নাটকটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পথনাটকের মাধ্যমে সমাজে নারীর নিরাপত্তাহীনতা, বৈষম্য এবং প্রতিনিয়ত চলমান সংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়।
নাটকের বিভিন্ন দৃশ্য ও সংলাপে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সমতার দাবি এবং একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দর্শকদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার বার্তাও তুলে ধরা হয়।
প্রতি বছরের মতো এবারও আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করেছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। দিবসটি উপলক্ষে র্যালি ও নারী সদস্যদের সম্মানে উপহার প্রদান করা হয়। ডিআরইউর নারীবিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস পান্নার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ। তিনি বলেন, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো আশঙ্কাজনকভাবে কম। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কর্মস্থলসহ সব ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা যেন আর দেখতে না হয়, সেটাই হোক নারী দিবসের অঙ্গীকার।
এদিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ইউনিকো হসপিটালও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করেছে। ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, পদক্ষেপ : সকল নারী ও মেয়েদের জন্য’ এ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে সকালে একটি বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করা হয়। পরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আমন্ত্রিত অতিথি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মীরা অংশ নিয়ে নারীদের অবদানকে সম্মান ও স্বীকৃতি জানান।
দিবসটি উপলক্ষে নারীদের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে উৎসাহিত করতে বিশেষ ছাড়সহ ‘ঝঐঊ’ নামে একটি ক্যানসার স্ক্রিনিং প্যাকেজ চালু করে ইউনিকো হসপিটাল। এতে সিবিসি উইথ ইএসআর, সিইএ, টিএসএইচ, এইচবিএ১সি ও ব্রেস্ট ইউএসজি পরীক্ষাসহ কমপ্লিমেন্টারি চিকিৎসা পরামর্শের সুবিধা রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ১১৫তম বছর উদযাপন করেছে এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ। এবারের বৈশ্বিক আহ্বান ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার-সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’ এ মূল সুরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সংগঠনটি ‘বিনিময়ে প্রাপ্তি’ দর্শনের মাধ্যমে নতুন পথচলার ঘোষণা দেয়।
এমএইচএম প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের চেয়ারপারসন হাসিন জাহান বলেন, আমরা যখন সচেতনভাবে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য কোনো আচরণ বা নীরবতা ত্যাগ করব, তখনই নিজের জন্য, নারীদের জন্য এবং সর্বোপরি সমাজের জন্য ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব হবে।
