বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে ‘ভ্যালু ফর মানি’তে জোর দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সরকার কাজ করছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি এই সেমিনারে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে নিতে সরকার নীতিগত পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে কাজ করছে। একই সঙ্গে, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্ভাব্য অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে বিভিন্ন নীতি এরই মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে কাজ চলছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে চলমান যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সেই বিনিয়োগ থেকে সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করাও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করা, অপচয় কমানো এবং বিনিয়োগ থেকে যথাযথ রিটার্ন পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করা এবং জনগণের আয় বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, এলডিসি উত্তরণ, মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প ও ম্যানুফেকচারিং খাত, সিএমএসএমই, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসহ আর্থিক খাতের ওপর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
তাসকীন আহমেদ বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের কারণে সামগ্রিক বৈশ্বিক বাণিজ্যে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে শিল্প খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় দেশের বেসরকারি খাতে অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক নতুন শুল্কনীতি স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পাশাপাশি খাতভিত্তিক পরিকল্পনা ও জ¦ালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অটোমেশন, প্রত্যক্ষ করের আওতা বৃদ্ধি, দেশীয় ব্যাংকব্যবস্থা হতে সরকারের ঋণগ্রহণের প্রবণতা হ্রাস ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মতপ্রকাশ করেন তাসকীন আহমেদ।
দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রত্যাহার, সুদহার হ্রাস, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, সাপ্লাইচেইন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখারও পরামর্শ তুলে ধরেন এই ব্যবসায়ী নেতা।
বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। এ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানির দাম না বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, ‘আমাদের সবকিছু ঠিকমতো চলছে না এবং এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে উদ্যোগী হতে হবে। সেই সঙ্গে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের আস্থা আছে কি না, তা নির্ধারণের মাধ্যমে সেটি ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হতে হবে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আনতে বাজেট, মুদ্রানীতি ও সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য কোনো খাতে আমরা স্বস্তিতে নেই। এখানে স্বস্তির পরিবেশ নিশ্চিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।’
