দুদকের কাঠগড়ায় আরও ৩৬ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং ব্যাংকঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান-তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গিয়ে শতাধিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। ২৩৯ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় নতুন মামলায় ফেঁসে যাচ্ছে ৩৬ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই পৃথক মামলা হবে।

দুদকের তথ্যমতে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ইউসিবি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিজের কর্মচারীদের নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলে ও পরিচিত ছোট ব্যবসায়ীদের নামে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখা থেকে ঋণের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ৫৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে ৩৭২ কোটি ৫৮ লাখ ২৩ হাজার ৫৩০ টাকা আত্মসাতের একটি তালিকা এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। তাতে দেখা গেছে, তিনি ব্যাংকটির বহদ্দারহাট শাখা থেকে ফেরদৌস এন্টারপ্রাইজের নামে ৭ কোটি, ফিউশন এটসের নামে ৭৫ লাখ, মানিক অ্যান্ড ব্রাদার্সের নামে ৮ কোটি, মৃদুল এন্টারপ্রাইজের নামে ৬ কোটি, সেন অ্যান্ড সন্সের নামে ৬ কোটি ও প্রভাতি ট্রেডার্সের নামে ৮ কোটি টাকা নিয়েছেন।

এ ছাড়া চকবাজার শাখা থেকে শাওন ট্রেডার্সের নামে ৭৫ লাখ, কদমতলী শাখা থেকে মেঘনা ট্রেডার্সের নামে ২৯ কোটি ৩৮ লাখ ২৩ হাজার ৫৩০ টাকা, মুরাদপুর শাখা থেকে আয়ুব অ্যান্ড সন্সের নামে ৩ কোটি ৫০ লাখ ও রহমত ট্রেডার্সের নামে ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিয়েছেন। পাহাড়তলী শাখা থেকে আবুল কালাম ট্রেডার্সের নামে ৭ কোটি, আহম্মদ অ্যান্ড সন্স ৬ কোটি, বুলু বার্ড এস্পোরিয়াম ১০ কোটি, ফেরদৌস অ্যান্ড ব্রাদার্স ৭ কোটি, হাবিবুর ট্রেডার্স ৭ কোটি, হক অ্যান্ড সন্স ৫ কোটি, জাহান ট্রেডিং ৭ কোটি, খালেক অ্যান্ড সন্স ৫ কোটি, খান অ্যান্ড ব্রাদার্স ৪ কোটি, বিশাল ট্রেডার্স ৪ কোটি ৭৫ লাখ, ইসলাম ট্রেডার্স ৫ কোটি, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ ৪৫ লাখ, নাজ ইন্টারন্যাশনাল ৮ কোটি ৫০ লাখ, রাহুল অ্যান্ড সন্স ৬ কোটি, রাসেল এন্টারপ্রাইজ ৭ কোটি, শফিকুল ট্রেডার্স ৫ কোটি, স্টেলার ট্রেডিং ৩ কোটি, জাইফা ট্রেডার্স ১ কোটি ৭৫ লাখ, জুম ইন্টারন্যাশনাল ১২ কোটি ও নুর ট্রেডার্সের নামে ৯ কোটি ৩০ লাখ নেওয়া হয়েছে। পোর্ট শাখা থেকে ড্রিম ইন্টারন্যাশনালের নামে ৮ কোটি জিএইচএম ট্রেডার্স ৩ কোটি হুসাইন ট্রেড ৯ কোটি ৫০ লাখ, খাজা ট্রেডিং ৯ কোটি ৫০ লাখ, এসএল এন্টারপ্রাইজ ৪ কোটি এবং স্টেশন রোড শাখা থেকে শাহ চাঁদ আওয়ালিয়া এন্টারপ্রাইজের নামে ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়েছেন। ইউসিবি ব্যাংকের চকবাজার, স্টেশন রোড, বদ্দারহাট. পাহাড়তলী ও পোর্ট শাখা থেকে ঋণের নামে ১৯টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে ১৩৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ১৯টি মামলা করেছে দুদক। মামলায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রী ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান রুকমীলা জামানসহ ব্যাংক কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।

দুদক কর্মকর্তারা বলেছেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ইউসিবি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনি কর্মচারীদের ব্যবসায়ী সাজিয়ে এবং পরিচিত ব্যবসায়ীদের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন। ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ইতিমধ্যে ১৯টি মামলা করা হয়েছে। এখন আরও ৩৬টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে ২৩৯ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

তারা আরও বলেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও আসামি করা হচ্ছে। যারা আসামি হচ্ছেন, তারা আতঙ্কে আছেন। ওই ব্যবসায়ীরা মূলত সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রতারণার শিকার হয়ে এখন দুদকের জালে জড়িয়ে পড়েছেন।

দুদকের তথ্যমতে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালানোর পর সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি), আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ দুদকে জমা হতে থাকে এবং কয়েক মাসের মধ্যে দুদকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। ওই তালিকায় রয়েছে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নাম। তিনি অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ও সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে পাঠান। দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি দল অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন।

দুদকের তথ্যমতে, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষগ্রহণ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেছে দুদক। সাইফুজ্জামানের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের অংশ হিসেবে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাইফুজ্জামান ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। গত বছরের ১৭ অক্টোবর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে থাকা দেশ-বিদেশের ৫৮০ বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমিসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের জব্দের আদেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। গত ১৫ জানুয়ারি নতুন করে আরও পাঁচ দেশে থাকা সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত, যা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে তার ৫৮১টি ফ্ল্যাট-বাড়ি ও আটটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই ফ্ল্যাটগুলোর মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। আর আটটি প্রতিষ্ঠানের মূল্য ২ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দেশের বাইরে তার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে দুদক।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৩ সালের উপনির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে আবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত