রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন, জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম)। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া হাফিজ উদ্দিন আহমদ আলোচনায় ছিলেন না। তবে তিনি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিন্তায় ছিলেন। ডেপুটি স্পিকার পদটি বিরোধী দলকে দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের দিক থেকে সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সরকারের ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে দেওয়া হয়। স্পিকারের মতো ডেপুটি স্পিকার নিয়েও চমক দিলেন সংসদ নেতা। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়েছেন বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যরা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে বিএনপি। এরপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে দলটি। এতে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং কায়সার কামালকে দেওয়া হয় ভূমি প্রতিমন্ত্রীর পদ। মন্ত্রিসভায় বাদ পড়েন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, ড. ওসমান ফারুক, ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানসহ অনেকে। সর্বশেষ গত বুধবার স্পিকার হিসেবে সারা দিন আলোচনায় ছিল আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নাম। বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যরা আভাস দিয়েছিলেন তাদের মধ্য থেকে কেউ স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হতে পারেন। নেতাদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে তাদের নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের কেউই স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার হিসেবে আসতে পারেননি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্পিকার কে হতে পারেন সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কারও সঙ্গে আলাপ করেননি। আমরা তার ওপর দায়িত্ব দিয়েছিলাম স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের বিষয়টি। তার চিন্তায় ছিলেন মেজর হাফিজ। শেষ পর্যন্ত তিনি চমক দেখিয়েছেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে স্পিকার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার সফলতা কামনা করছি। পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকার হিসেবে কায়সার কামালের সফলতা কামনা করছি। আশা করছি তিনিও ভালো করবেন।’
বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেজর (অব.) হাফিজ একজন ক্লিন ইমেজের নেতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার তিনি। দলের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেও তিনি সবসময় কথা বলেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে কোনো মামলা হয়নি।’
গত বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। সভা শেষে জাতীয় সংসদের এলডি হলে সংবাদ সম্মেলনে সংসদের নতুন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম (মনি) সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা সংসদ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছি। সিদ্ধান্ত তিনি দেবেন।’
গতকাল সকালে সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সাংসদ ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদে স্পিকার পদে নির্বাচনের জন্য একটি মাত্র মনোনয়ন পেয়েছি। তিনি হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি এই দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন।’ পরে তিনি প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য সরকারদলীয় চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলামের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাব সমর্থন করেন সংসদ সদস্য ও সংসদের সরকারদলীয় হুইপ রকিবুল ইসলাম।
নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের রয়েছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতার জন্য তিনি রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ বীরত্ব পদক ‘বীরবিক্রম’ অর্জন করেন। তিনি তৎকালীন পাকিস্তান ফুটবল দলের খেলোয়াড় ও অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৬৪ সাল থেকে টানা তিনবার পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুততম মানবও ছিলেন তিনি। তার বাবা ডা. আজহার উদ্দিন ১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে দুবার পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর বাবার পথ অনুসরণ করে রাজনীতিতে যোগ দেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ভোলা-৩ আসন থেকে তিনি ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদ নির্বাচন এবং ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। স্পিকার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এদিকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। ডেপুটি স্পিকার হিসেবে একটি মনোনয়ন উত্থাপিত হয়। নাটোর সদর আসনের সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু তার নাম প্রস্তাব করেন এবং লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের এ বি এম আশরাফ উদ্দিন মিজান তা সমর্থন করেন। কণ্ঠভোটে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এখন সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনে ৭২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। তিনি ১৯৭২ সালের ৩১ ডিসেম্বর নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার চত্রাংপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা প্রয়াত মোস্তফা কামাল মনছুর এবং মা বেগম যোবায়দা কামাল। পারিবারিকভাবেই জনপ্রতিনিধিত্ব ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটি ধারার মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা।
কায়সার কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়ে ব্যারিস্টার অ্যাট ল ডিগ্রি লাভ করেন। আইন পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন।
এদিকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার স্বেচ্ছায় দলীয় চেয়ারম্যান বরাবর পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন কায়সার কামাল। পদত্যাগপত্রে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উল্লেখ করেছেন, ‘আমি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সম্পাদকসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলাম।’
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম)। গতকাল দুপুরে জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরুর সময় এ কথা নিজেই জানান মেজর হাফিজ।
