সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬, ০১:১৪ এএম

নতুন সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো গতকাল ১২ মার্চ। স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। স্পিকার  সংসদ পরিচালনা করেছেন। একটি অনন্যসাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো তেরোতম সংসদ। এর আগের ৪টি সংসদ ছিল বিতর্কিত। নামে গণতন্ত্র, কিন্তু ওই ৪টি নির্বাচন বহুলভাবে বিতর্ক উসকে দিয়েছে এবং তা ছিল ভোটারবিহীন সাংসদ। ভোট ডাকাতি করে সদস্য সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তারা। জনগণের কোনো প্রকৃত অনুমোদন ছিল না। সংসদে ছিল না কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল। পোষা বিরোধী দল সেই সময়কার ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ থাকায় সংসদীয় গণতন্ত্র মৌলিকত্ব হারায়। সে সংসদ হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদী শক্তির ইচ্ছাপূরণের সংসদ। সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখার সাংবিধানিক স্বার্থে বর্তমান সংসদকে তেরোতম বলে চিহ্নিত করলেও, দীর্ঘদিন পর প্রকৃত পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় কার্যক্রম চালু হলো। বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে বৈচিত্র্যময় রূপ জাতি আশা করে, তা দেখা যাবে সংসদে। শুরুতেই সংসদ উত্তাপ ছড়াবে, তার আভাসও পাচ্ছে জনগণ। তর্কবিতর্ক, যুক্তিনির্ভর, শীলিত ও নমনীয় আচরণ এবং সংসদীয় কলাকৌশল আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদকে অর্থবহ, কার্যকর ও গঠনমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সরকারি ও বিরোধী দলের দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আমরা লক্ষ করেছি।

প্রথম দিনের বৈঠকে কার্য-উপদেষ্টা, প্রিভিলেজ কমিটি ও হাউজ কমিটি গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট সদস্যরা ওয়াকআউট করেছেন। এরপর সংসদ মুলতবি হয়ে গেছে দুদিনের জন্য। রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কোনো-না-কোনো অর্থবহ, ইতিবাচক উপাদান পাওয়া যায়। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন হচ্ছে সেই রাজনৈতিক বাঁক, যা গণতন্ত্রকে কেবল ফিরিয়ে আনেনি, আমাদের প্রত্যাশিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্যময় ধারা ফিরিয়ে এনেছে। এখন আমরা গণতন্ত্রকে চর্চার ভেতর দিয়ে নিজেদের শীলিত ও প্রজ্ঞাময় করে তুলতে শিখব। আর সেই জ্ঞান ও ধ্যানের আলোকে সংবিধানের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো সংস্কার করে নেব। এই সংসদ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক। জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে তৃণমূলের উৎপাদকের নিত্যবাস্তব সমস্যা-সংকটকে উপলব্ধি করতে হবে। ওই চর্চায় কেবল একজন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকাই প্রাধান্য পাবে না, সমগ্র দেশের সমস্যার ন্যায় ও যুক্তিসংগত সমাধান করতে হবে। আর এই কাজগুলোর দায়িত্ব বর্তেছে এখন সংসদ সদস্যদের ওপর। তারা আইনপ্রণেতা।

আইন প্রণয়নে নিজ দলের পক্ষের না হয়ে বহুদলীয় পক্ষের হলে ভালো ফল দেবে। মন্ত্রী-এমপিদের কথাবার্তায় সতর্ক ও সংযত আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যে রিকশাওয়ালা শহীদ গোলাম কিবরিয়া নাফিসের গুলিবিদ্ধ লাশ হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে প্রথম অধিবেশনে থাকার দাওয়াত দেওয়া থেকেও এটা প্রমাণ হয় যে, তারেক রহমান গণমানুষের প্রতি সংবেদনশীল এবং ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটবেন। বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে তারা সংসদীয় গণতন্ত্রের কেবল প্রবক্তাই নয়, তাকে রক্ষা ও কার্যক্রমে গণআকাক্সক্ষা প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত। দেশের উৎপাদনশীল খাতগুলোর পরিচর্যা ও উন্নতি সাধনে সংসদকে কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হলে, সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের মধ্যে যে ঔপনিবেশিক লিগেসি রয়ে গেছে, তা পরিহার না করলে প্রকৃত গণতন্ত্র ও জনসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। বিরোধী দল ওয়াকআউট করে সংসদীয় রীতিপদ্ধতিতে প্রথম দিন যুক্ত করেছে কার্যক্রমের বহুমাত্রিকতা। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা না করে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে ন্যায় ও কল্যাণকে নিশ্চিত করার বিষয়টি যেন তারা পোক্ত করেন, সেই আশা আমরা করতে চাই। কেবল তখন সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে। গণতন্ত্রের খোলস নয়, আমরা চাই প্রকৃত সত্তা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত