বোরো চাষে সংকট

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ১২:১৫ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সংঘাত আমাদের নানামুখী সংকটে ফেলেছে। আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যে এ সংকট প্রতিদিন আমরা লক্ষ করছি। কিন্তু কৃষি খাত যে এর চেয়ে কম সংকটে পড়েছে, এমন নয়। বিশেষ করে মৌসুমের বোরো চাষে, ডিজেলের তীব্র সংকটে সেচ ব্যাহত হচ্ছে। রাজশাহীর অনেক বোরোচাষি অভিযোগ করেছেন, তারা বিভিন্ন পাম্প ঘুরেও ডিজেল পাননি। খুচরা দোকানিরা কুড়ি টাকা বেশি নিয়ে প্রতি লিটারের দাম নিচ্ছে ১২০ টাকা। এর পরও, অনেক পাম্প ডিজেল দিতে অপারগ। তাদের ডিপোতে ডিজেল নেই। কাঁদো কাঁদো গলায় একজন কৃষক জানিয়েছেন, তার বোরো ক্ষেত শুকিয়ে যাচ্ছে। সেচ দিতে না পারলে, ফলন মার খাবে।

বোরো সেচনির্ভর ফসল। রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের চার জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এ-বছর দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ জমিতে বোরো চারা রোপণ করা হয়েছে। এ-তথ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের হিসাব মতে চার জেলায় (রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ১১ হাজার ৫৩৫টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ডিজেলচালিত ৩১৫টি। অগভীর নলকূপ রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৯টি। এখানে ডিজেলচালিত ৮৮ হাজার ২৬৮টি। আবার লো-লিফট সেচ পাম্প রয়েছে, এর মধ্যে ৭ হাজার ৪৫৮টি ডিজেলচালিত। এর বাইরে সোলারচালিত সেচ পাম্প রয়েছে। বাকি পাম্পগুলো বিদ্যুৎচালিত। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। সব মিলিয়ে ডিজেল সংকট ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি ও কৃষকই অর্থনীতির মৌলিক শক্তি। আর সেই শক্তি যদি ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে সংকটে নিপতিত হয়, তাহলে ১৮/১৯ কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য বোরো ধান উৎপাদনে সংকট কেমন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ সমস্যার সমাধান কী? আসলে পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহই সমস্যার একমাত্র সমাধান। এই পণ্যটি আমাদের মজুদে নেই বললেই চলে। ভারত থেকে ৫০ হাজার টন ডিজেল আসতে শুরু করেছে বটে, তা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায় দেওয়া জরুরি।

দেশের বোরো আবাদি জমির প্রায় ৬২-৬৫ শতাংশ জমিই ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। কৃষিতে ব্যবহৃত বিদ্যুতে যেভাবে ভর্তুকি দেওয়া হয়, ডিজেলেও তা দেওয়া যেতে পারে। সেটা বোরো উৎপাদনে ইতিবাচক ফল দেবে। চলমান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তেল রেশনিং ব্যবস্থা নিয়েছে, তা কেবল কৃচ্ছ্রই নয়, জাতীয় স্বার্থের একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এই উদ্যোগ জনগণের প্রতি সরকারের ন্যায়-কল্যাণ কায়েমের দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে আনছে। বৃহত্তর স্বার্থে স্বল্পকালীন দুর্ভোগকে জয় করতে হবে। এজন্য কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে বিত্তবানদের। তারা বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম ও কৃচ্ছ্র আরোপ করলে, প্রান্তিক জনপদের কৃষক জমিতে পানি সেচের সুবিধা পাবে যা ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে। আমাদের লক্ষ্য খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। কিন্তু এখনো সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। সেই অর্জন করতে হলে, ব্যাপক পদক্ষেপ নিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, গবেষণার ভেতর দিয়ে বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি, নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে হবে। ধান-চাল প্রধান খাদ্য হলেও মাছ, মাংস, দুধ, ফলমূলসহ অনেক ফসলে আনতে হবে সাফল্য। আমদানি করে এখনো আমাদের খাদ্যঘাটতি মেটাতে হয়, তার লাগাম টেনে ধরতে পারে খাদ্য ও বৈচিত্র্যময় উদ্ভাবন ও নিরাপত্তা। গম ও ভুট্টার পাশাপাশি নতুন ফসল যোগ করা যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য পূরণ করে দিতে পারে এর গবেষণা। আমদানি-নির্ভরতা ত্যাগ করে আত্মনির্ভর হতে হলে আমাদের যেতে হবে ওই পথে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত