বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৪ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে নিহত বর আহাদুর রহমান ও তার পরিবারের ৯ সদস্যের জানাজায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। বেলা আড়াইটায় জানাজা শুরুর আগে একে একে নিহত ৯ জনের খাটিয়া পাশাপাশি রাখা হয়। অনুষ্ঠিত এ জানাজায় রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, স্বজনসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে মরদেহগুলো মোংলা সরকারি কবরস্থানে নেওয়া হয়। পরে সেখানে তাদের দাফন করা হয়।
একই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু) ও তার বোন এবং দাদির জানাজা হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকসা গ্রামে। সেখানে গতকাল সকালে তাদের জানাজা শেষে দাফন করা হয়। এ ছাড়া জুমার নামাজের পর কনের নানির জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বেলা ১১টায় মাইক্রোবাসচালকের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, আবদুর রাজ্জাকের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। বৃহস্পতিবারের দুর্ঘটনায় আবদুর রাজ্জাক, তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে, এক পুত্রবধূ এবং চার নাতির মরদেহ রাখা হয় বাড়ির উঠোনে। একসঙ্গে এত লাশ দেখে নির্বাক হয়ে গেছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। জানাজা শুরুর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে আবদুর রাজ্জাকের বড় ছেলে আশরাফুল আলম (জনি) উপস্থিত সবার উদ্দেশে কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমার আর কিছুই থাকল না। বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী-সন্তান সবাই চলে গেল। এটিই হয়তো ছিল আল্লাহর ফয়সালা। আপনারা সবাই দোয়া করবেন, তাদের ক্ষমা করে দেবেন।’ সে সময় আশরাফুল আলমের আকুতি আর উপস্থিত মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা বলছেন, তারা কখনোই একসঙ্গে একই পরিবারের এত সদস্যের মৃত্যু দেখেননি। ঘটনাটা খুবই হৃদয়বিদারক।
এদিকে ওই দুর্ঘটনার তদন্তে কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। গতকাল বিকেলে এ তদন্ত কমিটি গঠন করেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন। বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মেজবাহ উদ্দীনকে প্রধান করে তিন সদস্যের ওই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির বাকি সদস্য হলেন পুলিশ বিভাগের বাগেরহাটের রামপাল সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) পরিদর্শক। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে যার অবহেলা প্রমাণিত হবে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গতকাল সকাল ১০টায় কয়রা উপজেলার নাকসা গ্রামের বাড়ির পাশের মাঠে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মার্জিয়া আক্তার মিতু, ছোট বোন লামিয়া ও দাদি রাশিদা বেগমের জানাজা হয়। জানাজায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের মরদেহ দাফন করা হয়। এ ছাড়া মিতু ও লামিয়ার নানি আনোয়ারা বেগমের মরদেহ পার্শ্ববর্তী দাকোপ উপজেলার পানখালি গ্রামে দাফন করা হয়েছে।
এর আগে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে ভোররাত সাড়ে ৪টায় মিতুসহ তিনজনের লাশ তাদের বাড়িতে পৌঁছায়। লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকে পাগলপ্রায় মিতুর বাবা, মা ও স্বজনরা। কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
দুই মেয়ে, নিজের মা আনোয়ারা বেগম ও শাশুড়ি রাশিদা বেগমকে হারিয়ে মিতুর মা মুন্নি খাতুনের অবস্থাও খুব খারাপ। আদরের দুই মেয়ে আর শাশুড়ির লাশ বাড়িতে আনার সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। কখনো দুই মেয়ের নাম ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠছেন। এ সময় মিতুর বাবা আবদুস সালাম মোড়লের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। দুই মেয়ে আর মাকে হারানো আবদুস সালামকে কেউ সান্ত্বনাও দিতে পারছিলেন না।
স্থানীয় আমাদী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জুয়েল জানান, এর আগে এমন ঘটনা তার ইউনিয়নে আর কখনো ঘটেনি। এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকে স্তব্ধ।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমানের (ছাব্বির)। কনের বাড়িতে বিয়ের পর বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে নববধূসহ কয়রা থেকে বাগেরহাটের মোংলার বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন বরযাত্রীরা। বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন ওঠেন একটি মাইক্রোবাসে। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাইবিজ এলাকায় পৌঁছলে বিপরীত দিক দিয়ে আসা নৌবাহিনীর বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে চারজন শিশু। আহত একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
