নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৭৪ পৃষ্ঠার এ রায়টি প্রকাশ হয়। রায় অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটি বহাল রেখেছেন সর্বোচ্চ আদালত। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময় সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই হবেন এ সরকারের প্রধান। আর আপিল বিভাগের এ রায়ের ফলে পুনরুজ্জীবীত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হবে আগামী চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়।
গত বছরের ২০ নভেম্বর তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করে আনা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে উদ্ভূত আপিল মঞ্জুর ও এ সংক্রান্ত রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন) নিষ্পত্তি করে রায় দেয়। রায়ে বলা হয়, ‘আপিল বিভাগের রায়টি (ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়) নথিদৃষ্টে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ, কলঙ্কিত। অতএব রায়টি সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হলো।’ রায়ে সংবিধানের চতুর্থ ভাগের পরিচ্ছেদ ২ক এর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত বিধানাবলি যা সংবিধান (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬ (১৯৯৬ সালের ১ নম্বর আইন) এর ধারা ৩ দ্বারা সন্নিবেশিত হয়েছিল, তা এই রায়ের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হলো।’ রায়ে বলা হয়, ‘পুনঃস্থাপিত ও পুনরুজ্জীবিত পরিচ্ছেদ ২ক এ বর্ণিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিধানাবলি কেবল উক্তরূপ ভবিষ্যত প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তিতে কার্যকর হবে।’ এ মামলায় সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষে শুনানিকারী আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগের এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে আগামী সংসদ নির্বাচনের সময়।
২০১১ সালে তখনকার প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করে। তবে, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ওই বছর তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়।
রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২৫ আগস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষে সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেন। এরপর পৃথক সময়ে একই বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন এ মামলার আপিলে পক্ষভুক্ত হন। আইনজীবীদের বক্তব্য শুনে আপিলের (লিভ) অনুমতি মঞ্জুর করে আপিল শুনানির নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। এরপর ১০ কার্যদিবসে কার্যদিবসে ১০ জন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করেছে বলে আপিল বিভাগের রায়ে বলা হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত বলে, ‘জাতীয় ঐকমত্য থেকে জন্ম নেওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বারবার সৃষ্ট সংকট দূর করা। সংবিধান যে গণতান্ত্রিক প্রাণশক্তিকে রক্ষা করতে চায়, এর (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) বিলুপ্তি তাকেই দুর্বল করে দেয়।’ রায়ে বলা হয়, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ধীরে ধীরে সংবিধানের কাঠামোর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। এটি কার্যত গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করেছে, যা নিজেই সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো।’
রায়ে বলা হয়, ‘এটি (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা) গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়েছিল, যখন এই আদালত (২০১১ সালে আপিল বিভাগের রায়) ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেন।’ আপিল বিভাগ রায়ে বলে, ‘সংক্ষিপ্ত আদেশ ও পূর্ণাঙ্গ রায়ের মধ্যবর্তী সময়ে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনসভা যে হস্তক্ষেপ করেছিল, এটি বিচার বিভাগের সংকট ব্যাখ্যা করার একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা যেতে পারে।’
আপিল বিভাগ রায়ে বলা হয়েছে, ‘পঞ্চদশ সংশোধনী সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন এনে মূলত ভবিষ্যতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাকেই বদলে দেয়। বিশেষত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে উদ্দেশ্য করে আনা বিস্তৃত সংশোধনীর মাধ্যমে এটিকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার ব্যবস্থা করা হয়।’ আপিল বিভাগ বলে, ‘পঞ্চদশ সংশোধনী শুধু দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় থেকে বিচ্যুতই হয়নি, বরং কিছুটা কৌশলের সঙ্গে এমনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের মূল বক্তব্যকে আগেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়।’
আপিল বিভাগের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আইনসভা বিচার বিভাগকে ইঙ্গিত ও নির্দেশ দিচ্ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। যদিও তা আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।’
আপিল বিভাগ আরও বলে, ‘পঞ্চদশ সংশোধনী বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের যে অংশ, তা সংক্ষিপ্ত আদেশের প্রতি অবমাননাকর হওয়ার উদ্দেশ্যেই প্রণীত হয়েছিল কি না সেই সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই প্রেক্ষাপটে উদ্বেগের বিষয় হলো, ত্রয়োদশ সংশোধনী-সম্পর্কিত রায়ের চূড়ান্ত সংস্করণে দেখা যায়, আদালত যেন আইনসভার চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই আগের সিদ্ধান্ত (আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে) থেকে সরে এসেছেন। আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপিত হবে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপিত বিধানগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা যাবে না উল্লেখ করে বলা হয়, এটি কার্যকর হবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে। পুনঃস্থাপিত এই ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হবে, যখন ত্রয়োদশ সংসদ তার মেয়াদ পূর্ণ করবে অথবা তার আগেই যেকোনো সময় বিলুপ্ত হবে।
