ইরানের কাছে মুল্যবান উপহার পেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নিজেই সে কথা জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন ইরান আমেরিকাকে ‘বিপুল পরিমাণ অর্থ’ সমমূল্যের একটি ‘উপহার’ দিয়েছে। এটি মূলত হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর থেকে কার্যত বন্ধ আছে এবং যার কারণে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তিনি বলেন, এই উপহার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং ‘তেল ও গ্যাস’ সংক্রান্ত। তবে সুনির্দিষ্টভাবে সেটি কী, তা তিনি খোলসা করেননি। এই রহস্যময় মন্তব্যটি এমন এক সময়ে এলো যখন এর আগের দিনই ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করেন এবং যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির জন্য পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও তেহরান কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তারা গতকাল আশ্চর্যজনক কিছু একটা করেছে। তারা আমাদের একটি উপহার দিয়েছে এবং সেই উপহারটি আজ এসে পৌঁছেছে। এটি একটি বিশাল উপহার যার মূল্য অনেক বেশি। আমি আপনাদের বলব না সেই উপহারটি কী, তবে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাপ্তি। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার কাছে এর একটিই অর্থ-আমরা সঠিক পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছি।
মার্কিন কমান্ডার-ইন-চিফ জানান যে, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে দুই দেশ যখন এগোচ্ছে, তখন তেহরানের পাঠানো এই 'উপহার' ছিল তেল ও গ্যাস সংশ্লিষ্ট। বিস্তারিত কোনো তথ্য না দিয়ে তিনি একে ‘খুবই তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় এটি হরমুজ প্রণালি-যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়-সংক্রান্ত কিনা, ট্রাম্প উত্তরে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব দেন।‘এটি (পণ্য) চলাচল ও প্রণালির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল,’ তিনি বলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন যে, এই ‘উপহার’ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তবে তিনি তার দাবির পুনরাবৃত্তি করেন যে ইরানি পক্ষ ‘সম্মত হয়েছে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।’ ট্রাম্পের দাবির কিছুক্ষণ পরেই, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে প্রচারিত একটি বার্তায় ইরান পারস্য উপসাগরকে বিশ্বের অন্যান্য অংশের সঙ্গে সংযোগকারী এই প্রবেশপথ বা প্রণালি দিয়ে ‘অ-শত্রুভাবাপন্ন জাহাজগুলোর’ নিরাপদ চলাচলের আশ্বাস দিয়েছে। ইরান গত কয়েকদিন ধরেই বলে আসছিল যে তারা বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে না, যদিও বিমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে অস্বীকার করায় অনেক জাহাজই এই পথ এড়িয়ে চলছিল।
এদিকে তেহরানের কার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করছে তা এখনও প্রকাশ করেননি ট্রাম্প, শুধু বলেছেন যে তিনি একজন ‘শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি।’
আমরা আসলে সঠিক লোকজনের সঙ্গে কথা বলছি এবং তারা একটি চুক্তির জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব’ ট্রাম্প বলেন। মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং তার উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তবে ট্রাম্প বলেছেন যে, খামেনি সিনিয়র এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় ইরানি কর্মকর্তাদের নিহতের অর্থ হলো ‘আমরা প্রকৃতপক্ষে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। এখনকার নেতারা আমরা যাদের নিয়ে শুরু করেছিলাম তাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।’
ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে এই আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বৈশ্বিক দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার-সবাই জড়িত রয়েছেন। তবে উইটকফ এবং কুশনার ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য পাকিস্তান যাচ্ছেন কিনা-এমন খবরের সত্যতা তিনি নিশ্চিত করেননি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আলোচনা গুরুত্বের সঙ্গে চললে জেডি ভ্যান্সও পরবর্তীতে সেখানে যোগ দিতে পারেন। এর আগে মঙ্গলবার (২৪মার্চ) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই দ্বন্দ্ব নিরসনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। তিনি জানান যে, তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এদিকে ট্রাম্প কৌতুক করে বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ‘এই সমস্যার সমাধান চান না’ কারণ তিনি ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রাখতে চান।ট্রাম্প যখন হেগসেথকে পোডিয়ামে ডাকেন, তখন তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদেরও এই আলোচনার অংশ মনে করি। আমরা বোমার মাধ্যমে আলোচনা করি।’
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে তেহরান। জাহাজে ইরানের হামলার কারণে প্রায় সব ধরনের ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের প্রথম চেষ্টা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক জোট গঠনের আহ্বান জানান, কিন্তু আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা তাতে সাড়া না দেয়নি। এ অবস্থায় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একাই এটি সামাল দিতে পারবে। গত শুক্রবার তিনি ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করায় অন্য দেশগুলোকে এর দায়িত্ব নিতে হবে। এর কয়েক ঘণ্টা পর তিনি জানান যে, পানিপথটি কোনোভাবে ‘নিজ থেকেই খুলে যাবে।’
