আমার স্বাধীনতা আমার দেশ

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০৪ এএম

২৬ মার্চ শুধু সময়ের এক দীপ্তিময় মুহূর্ত নয়, এটি ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়।  বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং স্বপ্নের স্মারক। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা সহজলভ্য নয়। এটি অর্জিত হয় সাহস, আত্মত্যাগ এবং একটি জাতির একত্রিত চেতনার মাধ্যমে। আকাশে দোলা দেওয়া লাল-সবুজের পতাকা যেন সেই অদম্য আত্মমর্যাদা ও প্রতিজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করে। ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে দাঁড়িয়েও, এই ভূখণ্ডের মানুষ মাথা নত করেনি। প্রকৃতপক্ষে, স্বাধীনতা মানবসত্তার গভীরতম ও সবচেয়ে কাক্সিক্ষত আকাক্সক্ষার একটি। তাই এই দিনটি এলে মনে হয়, কোথাও আমি স্বাধীনতার আনন্দে নিজেকে হারিয়ে ফেলব, কোথাও আমার হৃদয়ের গভীরে নেমে আসবে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ত্যাগ ও রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাসকে হৃদয়ে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারই যেন প্রতিদিন নতুন করে উচ্চারিত হয়। কারণ এই স্বাধীনতা আমরা রক্ত দিয়ে অর্জন করেছি, তাই এর মর্যাদা রক্ষাও সম্মিলিত দায়িত্ব। ইতিহাস সচেতনতা একটি জাতির ঐক্য ও জাতীয়তাবাদের মৌলিক ভিত্তি। কোনো জাতি তার অতীতকে যেমনভাবে স্মরণ করে, ঠিক সেভাবেই বর্তমানকে বোঝে এবং ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করে। ইতিহাস কেবল অতীতের বর্ণনা নয়; এটি জাতীয় পরিচয়ের নির্মাতা। কিন্তু ইতিহাস সবসময় নিরপেক্ষ থাকে না। অনেক সময় তা রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুসারে প্রক্রিয়াজাত হয়, পরিবর্তিত হয় কিংবা নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চাও অনেক সময় এই বাস্তবতার বাইরে থাকতে পারেনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে জিয়াউর রহমান যখন বিদ্রোহ করে বাঙালিদের পক্ষে অস্ত্র তুলে নেন, তখন তিনি জানতেন এই সিদ্ধান্তের পরিণতি কী হতে পারে। যদি পাকিস্তান বাহিনী তাকে বন্দি করতে পারত, তাহলে সামরিক আইনে তার বিচার হতো এবং মৃত্যুদণ্ড প্রায় নিশ্চিত ছিল। চট্টগ্রামের ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান তখন পাকিস্তানি বাহিনীর একজন আধিকারিক। কিন্তু যে স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞা তার হৃদয়ে ছিল, তা তাকে অন্য পথে নিয়ে গেল। ২৫ মার্চের রাত্রির হত্যাযজ্ঞের খবর পেয়ে তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলে বাঙালি সেনা ও ইপিআর সদস্যদের সমন্বয় ঘটান, পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৭ মার্চ সন্ধ্যা প্রায় ৬ থেকে ৭টার মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার থেকে প্রথমবার স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৮ মার্চ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কালুরঘাট বেতার এবং স্থানীয় ট্রান্সমিটারগুলো ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা ও কিছু সামরিক ইউনিট বার্তা প্রচার করে। বার্তার ভাষা কিছুটা পরিবর্তিত হলেও, জনগণ, সৈন্য এবং স্থানীয় ইউনিট একসঙ্গে শুনে প্রতিরোধের শপথ নেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, একাধিক সংস্করণ এবং সীমিত সম্প্রচারের কারণে ভাষাগত ভিন্নতা স্বাভাবিক। স্বাধীনতার বার্তাটি চট্টগ্রাম থেকে ধীরে ধীরে সারাদেশে পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যেমন- The Statesman, The Times of India ২৮ মার্চের সংবাদে এই ঘোষণার খবর প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক চেতনা, সামরিক প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবকিছুর সংমিশ্রণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকটি দৃঢ় হয়ে ওঠে। মেজর জিয়াউর রহমান শুধু  কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন না; তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার ইতিহাস আসলে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনতার আন্দোলন এবং সামরিক প্রতিরোধ একসঙ্গে মিলেই জন্ম দিয়েছে আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র। যেখানে রাজনৈতিক, সামরিক এবং সামাজিক সব উপাদান একসঙ্গে কাজ করেছে। এটি আমাদের শেখায় যে,  ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ কখনো নিরপেক্ষ হতে পারে না, তবে নির্ভরযোগ্য দলিল ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করলে আমরা সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে পারি। যে কারণে ২৬ মার্চ এলে আমাদের উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার দিনকে বিদায় দিয়ে,  ইতিহাসকে নতুন করে ভাবার এক নীরব আহ্বান জাগিয়ে তোলার সময় এসেছে। এটি লাখো মানুষের ত্যাগ, অগণিত স্বপ্ন এবং একটি জাতির সম্মিলিত সংগ্রামের প্রতিফলন। হয়তো ইতিহাসকে নতুন করে বোঝার মধ্য দিয়েই আমরা একদিন এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারব। তখন স্বাধীনতার সত্যিকারের আনন্দের সূর্য আমাদের হৃদয়ের আকাশে দীপ্ত হয়ে উঠবে আর সেই শিখার আলোয় বাংলাদেশের আকাশ এমনই আলোকিত থাকবে যে, কোনো কালরাত্রিই আর বাংলাদেশের বুকে নেমে আসতে পারবে না।

স্বাধীনতার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ স্বাধীনতাকে নিজের সত্তা মনে করে। মানুষ কখনো নিজেকে অস্বীকার করে না। যে কারণে স্বাধীনতার মূল চেতনা এবং অধিকার এ দেশের মানুষকে একজন মুক্ত মানুষ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করবে। দৃঢ় আত্মবিশ্বাস এবং স্বাধীনচেতা মানসিকতাই স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ অর্জন। আমরা যেন একে পরম মমতায় আগলে রাখি। সবাই বাংলাদেশের যুক্তিশীল স্বাধীন নাগরিক এটাই হোক মূল পরিচয়। জয়তু স্বাধীনতা।

লেখক : আইন পরামর্শক ও চেয়ারম্যান

 ইক্ষাণ ল অ্যাসোসিয়েটস অ্যান্ড

 কনসালট্যান্সি ফার্ম

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত