প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করা সেই জাকারিয়া পেলেন পদোন্নতি

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৩৩ এএম

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান জাকারিয়া সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। গত ২৫ মার্চ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন, বিএফএসএতে নীতির অপব্যবহারকারী ও প্রভাবশালীদের তোশনে পটু সরকারের এ কর্মকর্তাকে নিরাপদে পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

বিএফএসএ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠানটিতে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, দুই বছরের দায়িত্ব পালনের সময়ে এই কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটিকে শুধু দুর্বলই করেননি, বরং অকার্যকর করে রেখেছিলেন। যে কারণে দেশের নানা খাদ্যপণ্যে যখন কি না ভেজাল, ভারী ধাতুসহ ক্যানসার তৈরিকারী উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে, তখন এসব দূর করতে কোনো ভূমিকা নেই বিএফএসএর।  বরং বিএফএসএর টাকায় গবেষণা করে খাদ্যে ভেজালের যেসব প্রমাণ মিলেছে তাতেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি চেয়ারম্যান। তার এমন কর্মকা-ের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো কর্মকর্তা প্রতিবাদ বা আলোচনা করলে তাদের ওপর নেমে আসত কারন দর্শানোর নোটিসের নামে প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ।

বেশ কয়েকটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান জাকারিয়া বলেন, ‘এই গবেষণার দায় শুধু সংশ্লিষ্ট গবেষকের। এটা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নয়।’ অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো গবেষণার ফলাফল ধরে নির্দিষ্ট খাদ্য থেকে কীভাবে ক্ষতিকর উপাদান দূর করা যায় তা নিয়ে কাজ করার। 

তিনি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নেওয়ার আগে খাদ্যপণ্যের একেকটি খাত ধরে ব্যাপক হারে পণ্য ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার রীতি ছিল কর্তৃপক্ষের। কীটনাশক, জর্দা, দুধ, পাউরুটি, ব্রয়লার মুরগি, চালসহ নানান পণ্যের পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী উৎপাদনকারীদের নিয়ে সভা করে ক্ষতিকর উপাদান কীভাবে দূর করা যায় সে পদক্ষেপ নেওয়া হতো। কিন্তু তিনি যোগদানের পর থেকেই এ ধরনের কার্যক্রম থেকে একেবারেই বেরিয়ে আসেন এই কর্মকর্তা।

অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তার অদক্ষতার কারণে বিএফএসএর শক্তিশালী আইনের প্রয়োগও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। বিএফএসএ নিজেদের মোবাইল কোর্ট ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে কর্মকর্তা পাঠানো শুরু করে ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। যেখানে বাজারে আইন প্রয়োগ হয় ভোক্তার। অথচ ভোক্তার এসব মোবাইল কোর্টের ভিডিও কর্তৃপক্ষের ফেসবুক পেজে দিয়ে তিনি ভিউ গণনা করতেন। একই সঙ্গে যোগদানের পর থেকেই কীভাবে নিজের পদ টিকিয়ে রাখা যায় তা নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন। যার নমুনা দেখা যায় যোগদানের পর।

২০২৪ সালের মে মাসে জাইকার অর্থায়নে ইন্দোনেশিয়ায় এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় গিয়েছিলেন চেয়ারম্যান জাকারিয়া। সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন খাদ্য সচিব ইসমাইল হোসেন, ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যানসহ আরও অনেকে। সে সময় কর্মশালায় উপস্থিত বিদেশিদের উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন নৌকার রেপ্লিকা, যা চেয়ারম্যান নিজেই আড়ং থেকে কিনেছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তারা বলছেন, যাদের তিনি প্রশিক্ষণে নিয়ে যেতেন সেটা শুধু চেয়ার রক্ষার জন্য। অথচ আওয়ামী সরকারের পতনের পরই আবার তিনি ভোল পাল্টে বিভিন্ন দলের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন। যার ফল হিসেবেই সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে মনে করছেন সমালোচকরা।

জানা গেছে, যে কর্তৃপক্ষ সারা দেশের খাবারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের কাজ করছে সেখানেই ঢুকে পড়েছে ভেজাল খাদ্য। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবসের’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অডিটরিয়ামে। বিএফএসএ ২ ফেব্রুয়ারির এ আয়োজনে অনুষ্ঠানটিতে আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ছিল ৩০০ জন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সে সময়ের সচিবসহ অন্যান্য যেসব অতিথি ছিলেন তাদের দুপুরের খাবার হিসেবে ভাত, মুরগি এবং রুই মাছ সরবরাহ করেছিল নওরিশ ল্যাব নামের একটি প্রতিষ্ঠান। যারা ওই হাসপাতালে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করে। তবে দুপুরের যে খাবার প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহ করেছিল তার পুরোটাই ছিল পঁচা এবং বাসি। যে কারণে কোনো অতিথিই এই খাবার খেতে পারেননি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়লের কর্মকর্তারা ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আবার অন্য রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে পাঠিয়েছিলেন এই চেয়ারম্যান।

গত বছরের শেষভাগে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে উঠে এসেছে, দেশের প্রায় প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে চারজনের রক্তেই ‘উদ্বেগজনক’ মাত্রায় সিসার উপস্থিতি রয়েছে। এতে বলা হয়, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ শতাংশের (অর্থ্যাৎ প্রায় প্রতি ১০ জনে ৪ জন শিশু) এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রায় ৮ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা ‘নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি’। এই গবেষণায় ১১ হাজার রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। অথচ কোন ধরনের খাবার থেকে সিসা উল্লিখিতদের শরীরে প্রবেশ করছে, তার কারণ অনুসন্ধান বা এ বিষয়ে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৭১৩টি নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৪২টি নমুনা মানসম্মত পাওয়া গেলেও বাকি ৫৭১টি নমুনার ফলাফলে ভেজাল পাওয়া যায়। অর্থাৎ মোট নমুনার প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্যই মানবর্হিভূত। কিন্তু এই ৫৭১টি বা ৩০ শতাংশ মানবহির্ভূত নমুনার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো জোরালো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। শুধু একটি করে চিঠি পাঠিয়ে দায় সেরেছে।

গত বছরের শেষদিকে আহমেদ ফুডসহ অন্য আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের কেওড়া ও গোলাপজল বাজার থেকে প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তি জারি করলেও সেগুলো বাজারে দেদার বিক্রি হয়েছে। কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। সর্বশেষ চা পাতা পরীক্ষা করে তাতে হেভি মেটালের উপস্থিতি পেয়েছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেই পরীক্ষার ফলাফল ফাইলবন্দি করে রেখেছেন, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বরং যেসব কর্মকর্তা কাজ করতে চান তাদেরও দমিয়ে রাখার ভূমিকায় ছিলেন চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানটির কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে মতের বিরোধ হলেই দেওয়া হতো কারণ দর্শানোর নোটিস। গত দুই বছরে প্রায় দেড়শ কর্মকর্তাদের নামে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছেন এই কর্তা, যা মূলত কর্মকর্তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা তৈরি করার নামান্তর বলে জানা গেছে।

বিএফএসএ চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে গত ডিসেম্বরে জানিয়েছিলেন, লেড ফ্রি বাংলাদেশ গড়ার কার্যক্রম শুরু করতে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিএফএসএ। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের কোনো গতি নেই বলেই জানা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত