ওয়ান-ইলেভেনের সময়কালে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টারের (এনএমসি) নীতিনির্ধারক ছিলেন। ২০০৮ সালে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) আওতাধীন গড়ে ওঠা মোবাইলফোন আড়িপাতার কারিগর বলা হয় তাকে। এনএমসি পরবর্তীতে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারে (এনসিএমসি) রূপান্তর হলে তারও দায়িত্বে ছিলেন ডিজিএফআইর সাবেক এই মহাপরিচালক। ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তৎকালীন সরকার প্রধানের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবেও কাজ করেন শেখ মামুন। বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম ও ইলিয়ান আলী গুমের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ত তার তথ্য পাওয়া গেছে। গত বুধবার রাতে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাসে এসব তথ্য জানা যায় বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলায় শেখ মামুনকে আদালতে নেওয়া হয়। অভ্যুত্থানকালে রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন নামে এক আন্দলোনকারীকে হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই কফিল উদ্দিন সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ছিদ্দিক আজাদ উভয়পক্ষের শুনানি শেষে জামিনের আবেদন নাকচ করে পাঁচ দিনের রিমান্ড মন্জুর করেন। রিমান্ড ও জামিন শুনানিকে শেখ মামুন খালেদ আদালতে বলেন, ‘এক-এগারোর সময় তিনি কুমিল্লায় কর্মরত ছিলেন। সে সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জামিনের ব্যাপারে তিনি সরাসরি ভূমিকা রাখেন।’ তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে জানায়, শেখ মামুনকে ‘বুধবার রাতে আটক করা হয়। বৃহস্পতিবার আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এনএমসি ও এনসিএমসির দায়িত্বপালনের সময় মোবাইলফোনে আড়িপাতায় তিনি (মামুন) সর্বোচ্চ ভূমিকায় ছিলেন। বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম ও ইলিয়ান আলী গুমের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার তথ্যও রয়েছে।
সূত্র জানায় ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে সিগন্যালস কোরের কর্মকর্তা হিসেবে শেখ মামুন ডিজিএফআইতে পরিচালক (এফএসআইবি) হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০০৮ সালের জুনে তিনি ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী ফজলুল বারির স্থলাভিষিক্ত হয়ে পরিচালকের (কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর-সিআইবি) দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবরের উত্তরসূরি হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১১ সালে মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে ডিজিএফআইতে ফিরে আসেন রিমান্ডে এক-এগারোর সময়কালে দায়িত্বরত অবস্থায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ের বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শেখ মামুন খালেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছিল। এর মধ্যে ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করার অভিযোগ, এক-এগারোর সময় তার বিতর্কিত ভূমিকা এবং জলসিঁড়ি আবাসন-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়গুলো রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।
এর আগে গত বছরের মে মাসে শেখ মামুন খালেদ ও তার স্ত্রী নিগার সুলতানার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ আদেশ দেয়। ওই সময় দুদক তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছিল।
আদালত প্রতিবেদক জানায়, গতকাল রিমান্ড আবেদনে বলা হয়-২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে মিরপুর ১০ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী হামলা চালায়। এ সময় শেখ মামুন খালেদের আদেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত দেলোয়ার হোসেন ২১ জুলাই শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান। হত্যাকা-ের মূল রহস্য উদ্ঘাটন, এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার, অচেনা আসামিদের সঠিক নাম-ঠিকানা সংগ্রহ ও ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। ডিজিএফআইয়ের সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা মামুনের এক-এগারোর সময়কার ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এর আগে গত সোমবার রাতে এক-এগারোর কুশীলবদের অন্যতম লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। মানব পাচারের একটি মামলায় বর্তমানে তিনি পুলিশি রিমান্ডে আছেন।