জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে সরকারের দেশ জুড়ে ভোগান্তি চলছেই

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে। অস্বাভাবিক দামে জ্বালানি আমদানি আর সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে গিয়ে বড় ধরনের চাপে পড়েছে সরকার।

যুদ্ধের প্রভাবে গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়ে ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে জ্বালানি তেল আমদানিতে গত এক মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় এ ক্ষেত্রেও সরকারের বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।

শুধু মার্চ ও এপ্রিল মাসে সাতটি এলএনজি কার্গো আমদানিতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। এমনিতেই এলএনজি খাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়; বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে সেই ভর্তুকির পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বাড়বে। এমনকি লাভজনক খাত হিসেবে বিবেচিত জ্বালানি তেলও এখন ভর্তুকি দিয়ে বিক্রি করতে হতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে অতিরিক্ত ঋণ সহায়তা চেয়েছে সরকার। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে এমন আশ্বাসেও দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তেল পেতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তেলের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এরপরও অনেকেই তেল কিনতে পারছেন না।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই। বরং গত বছরের তুলনায় বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। কিন্তু মানুষ আতঙ্কে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনছে। সেই সঙ্গে কালোবাজারিও হচ্ছে। অনেকেই তেলের অবৈধ মজুদ করছে। এসব কারণেই সংকট। বিষয়গুলো নিয়ে সরকার যথেষ্ট কনসার্ন। তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশে দাম না বাড়িয়ে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের চেষ্টা করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে সবাইকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

তেল নিয়ে যারা কারসাজি করছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বলছে সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে জ্বালানি তেল নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তার মানে কোথাও একটা ঘাপলা বা মিসিং আছে। সে বিষয়টি সরকারকে দ্রুত খুঁজে বের করে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তা ছাড়া বর্তমান যে সংকট সেজন্য তো সরকার দায়ী নয়। ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশ জ্বালানি নিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। তাহলে আমাদের সেটা করতে সমস্যা কোথায়? সরকারকে প্রকৃত বাস্তবতা জনগণকে জানানো দরকার। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও আরও সাশ্রয়ী এবং সচেতন হওয়া উচিত।’

আমদানি ব্যয় আকাশচুম্বী : মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে কাতারের রাস লাফান শিল্পাঞ্চলের এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহে বড় ধরনের বিঘœ ঘটেছে। বিশ্বে এলএনজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ আসে এই কেন্দ্র থেকে।

বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশই কাতার থেকে আসে। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় ইতিমধ্যে একাধিক কার্গো বাতিল হয়েছে। এতে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা বেশি এবং দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথেও বিঘœ সৃষ্টি হওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের দুটি বড় চালান ইতিমধ্যে আটকে গেছে।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও দেশীয় উৎপাদন অনেক কম। এলএনজি থেকে ৯০-১০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ যোগ হলেও ঘাটতি থেকেই যায়। একটি কার্গো বিলম্বিত হলেই প্রতিদিন ৪০-৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়। ফলে সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস রেশনিং শুরু করেছে।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি হামলার আগের দিন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ৪৮ ডলার, যা বর্তমানে বেড়ে ১০৫ দশমিক ৯ ডলারে পৌঁছেছে। আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজির দাম ছিল প্রতি হাজার ঘনফুট ৯-১৪ ডলার এবং স্পট মার্কেটে ১২-১৫ ডলার। সাম্প্রতিক সংকটে সেই দাম বেড়ে ২০-২৫ ডলারে উঠেছে, এমনকি কিছু কার্গো ২৮ ডলার পর্যন্ত দরে কিনতে হয়েছে।

চলতি মাসে প্রথম দুই কার্গো এলএনজি ২৩-২৮ ডলার দরে কিনতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এরপর তিন কার্গো ২০-২১ ডলারে কিনতে প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। সর্বশেষ দুই কার্গো ১৯ দশমিক ৭৭ ডলার দরে কিনতে প্রায় ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আগে যেখানে একটি কার্গো কিনতে ৫০০-৬০০ কোটি টাকা লাগত, এখন তা বেড়ে ৮০০-৯০০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৪০-৬০ শতাংশ।

সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য উৎস থেকে এলএনজি আমদানির চেষ্টা করছে এবং নতুন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সম্ভাবনাও যাচাই করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারের সামনে দুটি পথ থাকবে ভর্তুকি বৃদ্ধি অথবা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সমন্বয়। তবে বর্তমান বাস্তবতায় ভর্তুকি বাড়ানোর দিকেই ঝোঁক বেশি থাকতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

ভর্তুকির চাপ বাড়ছে : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যদিও প্রকৃত ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৫ সালে ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার বেশি। এলএনজি খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে তা ৬ হাজার কোটি টাকায় নামানোর লক্ষ্য থাকলেও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে তা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তেলের সংকটে ভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলা : জ্বালানি তেলের সংকটে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। রাজধানীসহ মহাসড়ক ও জেলা শহরের পেট্রোল পাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে; অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ অংশে সবচেয়ে তীব্র সংকট দেখা গেছে। সিদ্ধিরগঞ্জ ও কাঁচপুর এলাকায় অনেক পাম্পে অকটেন বিক্রি বন্ধ রয়েছে, কোথাও আবার টানা দুই সপ্তাহ ধরে অকটেন নেই। সীমিত আকারে শুধু ডিজেল বিক্রি চলছে।

রাজধানীর বিজয় সরণি, আসাদগেট ও মিরপুর এলাকাতেও একই চিত্র। অনেক পাম্প নির্ধারিত সময়ের আগেই বিক্রি বন্ধ করে দিচ্ছে আবার সীমিত সরবরাহের কারণে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।

ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় পরিস্থিতি আরও নাজুক। কোথাও ‘তেল নেই’ লিখে পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে তেলসংকটকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতার হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

দিনাজপুরে তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে এক মোটরসাইকেল চালকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে।

পাম্প মালিকদের মতে, সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও চাহিদার তুলনায় কম থাকায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ঘিরে আতঙ্কে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল মজুদ করছেন, ফলে চাপ আরও বেড়েছে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ১২ দিনের জ্বালানি মজুদ আছে। পাশাপাশি নিয়মিত জ্বালানি আমদানি অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া আমেরিকা, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তানসহ বিভিন্ন নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা চলছে।

এদিকে গতকাল ১০ হাজার টন ডিজেল এবং ২০ হাজার টন জেট ফুয়েল (উড়োজাহাজের জ্বালানি) নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। আগামী ৩১ এপ্রিল আরও ৩০ হাজার টন জ্বালানি তেল দেশে আসার কথা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত