আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও সংসদ

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৪ এএম

‘যুদ্ধ ভয়াবহ’- এই কথা সবাই বললেও, যুদ্ধের হাত থেকে বিশ্ব মুক্তি পায় না। কেন? এমন প্রশ্নের রাজনৈতিক উত্তর আছে। সম্পদ দখল, রাজনৈতিক সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মিলিত রূপ যে বাজার দখল, তা আর গোপন নেই। ইরানের ওপর হামলা তা আরও খোলামেলা করে দিয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের মানুষের ভাতের পাতেও যে প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।  বিশ্বরাজনীতির এই উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিও ঘটনাবহুল পথ অতিক্রম করছে। ইতিমধ্যেই  নানা ঘটনা এবং ভীষণ উত্তেজনার মধ্য দিয়ে প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন বিএনপি সরকার পথ চলছে। রাজনীতিতে ‘কৌশল’ কথাটা সব সময় ব্যবহৃত হয়। এখন বলা হচ্ছে যে, নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক জোট এবং কৌশল দিয়ে জেতা যাবে না, প্রয়োজন হয় ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। ভোটের প্রচার, ভোট প্রদান, ভোট গণনা এবং ভোটের ফল প্রকাশ সব কিছুই নাকি চলে বিশেষ কারসাজিতে। এবারও নাকি সেটাই ঘটেছে। ফলে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, মামলা, নির্বাচনের ফল নিয়ে আপত্তি এবং বিশ্লেষণ চলতে চলতেই শুরু হলো সংসদ অধিবেশন।  রাজনীতির ক্ষেত্রে এই সংসদ যেমন দীর্ঘ প্রতীক্ষার, তেমনি সংসদ নির্বাচন জন্ম দিয়েছে নানা শাসনতান্ত্রিক প্রশ্ন। ইতিমধ্যে যেসব কথা সরকারি এবং বিরোধী দল বলতে শুরু করেছে, তাতে দেশের মানুষের একটা মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়ে আছে। অনেকে মনে করছেন সংসদ খুব ভালোভাবে চলবে না।

রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে বিতর্ক যেমন থাকে, সাধারণ মানুষের আলোচনাও তেমনি চলতে থাকে। বাংলাদেশ রাজনীতিতে আগ্রহী মানুষের দেশ। ‘আমরা রাজনীতি বুঝি না’ বলে একদল মানুষ যতই প্রচার করার চেষ্টা করুক না কেন, সাধারণ মানুষ কিন্তু প্রায় সর্বক্ষণ মেতে ওঠে রাজনৈতিক আলোচনায়। সেটা ঘর, চায়ের দোকান, রাস্তা কিংবা কর্মক্ষেত্রে। বিতর্ক, বিরোধ এবং সংঘাত যে ঘটে তার ভেতরেও রয়েছে রাজনীতি। কখনো কখনো ক্ষমতাসীন দলের দাপটের কাছে চুপ করে থাকলেও, সুযোগ পেলেই শুরু হয় রাজনৈতিক আলোচনা। ফলে এটা ধরে নিতেই হবে, ২৪ সালে সংঘটিত অনিবার্য অভ্যুত্থান এবং তারপর প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে আলোচনা চলবে আরও বহুদিন। সংসদ অধিবেশন শুরু থেকেই ছিল নাটকীয়তায় ভরা। প্রথম উত্তেজনা, শপথ নিয়ে। টানাপড়েন তৈরি হয় সংসদ সদস্যরা কোন শপথ গ্রহণ করবেন, ‘সংবিধান সংস্কার’ পরিষদ নাকি ‘জাতীয় সংসদ সদস্য’ নাকি দুটোই। বিরোধী দল হিসেবে জামাত প্রথমে জানিয়েছিল, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিলে তারা সংসদ সদস্যের শপথ নেবে না। বিএনপি বলেছিল, যেহেতু তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেবেন না। টানটান উত্তেজনার মধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। শপথের জন্য নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি ফরম দেওয়া হয়। এর একটি ছিল সাদা রঙের, যেটি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। অন্যটি ছিল নীল রঙের, যেটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদ সদস্যের শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন। আর তার পরপরই জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলে। তারা জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন। ফলে এনসিপির কোনো উপায় থাকল না। জামায়াতে ইসলামীর পরপর তারাও শপথ নিলেন। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পৃথকভাবে এই দুই শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ফলে জট থেকেই গেল।

ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন না, আর বিরোধী দলের কাতারে যারা থাকবেন তারা শপথ নিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ তা হলে কীভাবে কাজ করবে, এই প্রশ্ন এবং আশঙ্কা জনমনে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে এর আগে কোনো সংসদই খুব বেশি প্রাণবন্ত বিতর্ক তৈরি করতে পারেনি। যেটুকু ছিল ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ তার সেই চরিত্রও হারিয়ে ফেলে। বিতর্কের অনুষ্ঠান সবচেয়ে বিরক্তিকর অনুষ্ঠানে পরিণত হয়ে পড়ে। এরপর ২০১৪, ২০১৮ সালের সংসদে বিরোধী দলের সরকারি ভূমিকা রাজনীতিতে হাসি-তামাশার সঞ্চার করেছিল। ‘২৪’র আমি-ডামির নির্বাচনে গঠিত সংসদ অবশ্য কোেেনা ভূমিকা রাখার আগেই বাতিল হয়ে গিয়েছে। কেমন সংসদ চাই তা নিয়ে আন্দোলন হলেও, কেমন সংসদ সদস্য চাই সেই প্রশ্নে মনে হয়, জনমনে তেমন আলোড়ন তৈরি হয়নি। সংসদ সদস্যের দায়িত্ব ও কর্র্তৃত্ব কতখানি সে ধারণাও সম্ভবত স্পষ্ট নয়। তাই নির্বাচনের সময় ইহকালে উন্নয়নমূলক কাজ, নানা সুবিধা দেওয়া আর পরকালে বেহেশত পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে কারও আটকায় না। শপথ বিতর্কের কোনো সমাধান না হলেও, সবাই যার যার মতো করে ব্যাখ্যা করছেন। আসলে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ কী? এর সমাধান হওয়ার আগেই এলো সংসদে উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া নিয়ে উত্তেজনা। প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার না পাওয়া যাওয়ায়-একজন সিনিয়র সংসদ সদস্যকে সভাপতি করে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হলো। ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ২০২৬ সালের ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় শুরু হয়েছে। অধিবেশনের প্রথম দিনই উত্তেজনা শুধু নয় এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা অনেকদিন দেশের রাজনীতিতে আলোচনা ও বিতর্কের খোরাক জোগাবে। অধিবেশনের শুরুতে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদে সংসদ কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন। তারা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে রাষ্ট্রপতির পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে, তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চিৎকার এবং ব্যাপক হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্য শেষ করেন। তার বক্তব্যে বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদী কাজের সমালোচনাও করেন। একটি ঘটনা জনমনে খুবই আলোড়ন তৈরি করে। তা হলো, জাতীয় সংগীতের সময় বিরোধী দলের আচরণ।

জাতীয় সংগীত বাজার সময় বিরোধী দলের সদস্যদের প্রথমে না দাঁড়ানো এবং পরবর্তী সময়ে দাঁড়ানো নিয়ে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদিও তারা ব্যাখ্যা দেন যে, মাইকে জাতীয় সংগীত তারা শুনতে পারেননি। আর একটি বিষয় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা হলো অধিবেশন চলাকালে দর্শক গ্যালারিতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতি। সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশন আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে থাকায় বা পদত্যাগ করায় দীর্ঘদিনের সংসদীয় প্রথা ভেঙে কোনো স্পিকার ছাড়াই অধিবেশনের কাজ শুরু হয়েছিল, যা পরে স্পিকার নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। জাতীয় সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির প্রথম বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যাদি নিষ্পন্নের জন্য, সময় বরাদ্দ ও অধিবেশনের স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর মোট ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ৩টায় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে এবং ৩০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সমাপ্ত হবে। প্রয়োজনে অধিবেশনের সময় ও কার্যদিবস সম্পর্কিত যে কোনো বিষয় পরিবর্তনের ক্ষমতা স্পিকারকে প্রদান করা হয়। সংসদে যে বিতর্ক হবে, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছে জমা পড়া প্রশ্নের সংখ্যা দেখে।

এ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য ৮টি এবং অন্যান্য মন্ত্রীর জন্য ৪৬০টি প্রশ্নসহ মোট ৪৬৮টি প্রশ্ন এসেছে। বিধি-’৭১-এ মনোযোগ আকর্ষণের নোটিস পাওয়া গেছে ২৭টি এবং সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবের সংখ্যা (বিধি-১৩১) এ ৯৭টি নোটিস পাওয়া গেছে। ফলে বিতর্ক জমে উঠবে। ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে যে,  যারা রাষ্ট্রপতিকে অবৈধ বলে তার বক্তব্যের সময় ওয়াকআউট করলেন তারা রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের ওপর আলোচনা করবেন? যারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছেন, তাদের শপথের কার্যকারিতা থাকবে কি? জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ কী হবে? এই সনদে যারা ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ দিয়েছেন তারা কি এটি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন? অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশ কি আইনে পরিণত হবে? বলা হয়ে থাকে, সংসদীয় রাজনীতিতে সংসদ হবে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। নীতি ও আইন প্রণয়নে বিতর্ক হবে, বিরুদ্ধ মতটাও গুরুত্ব পাবে। অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক শিষ্টাচারের যে ব্যাপক অবনমন ঘটেছে, তার ছোঁয়া কি সংসদেও লাগবে? এই আশঙ্কা কিন্তু অনেকটাই আছে। অর্থনীতিতে লুটপাট থাকলে, রাজনীতি যে তার বাইরে যেতে পারে না, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ফলে নির্বাচন হয়ে পড়েছে টাকার লড়াই, ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি সেখানে দলীয় প্রতীক এবং ধর্মীয় আবেগ দুটোই ব্যবহৃত হয় নির্বাচনে ভোটারের সমর্থন পাওয়ার জন্য। দলীয় প্রতীক পেতেও টাকা, ধর্মের নামে নির্বাচন করলেও টাকা একটা প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারও যে সংসদ গঠিত হয়েছে, সেখানে টাকাওয়ালাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য। ফলে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে যতই বিতর্ক হোক না কেন, শেষ বিজয় তো ব্যবসায়ীদের। রাজনৈতিক বিতর্ক আর অর্থনৈতিক লুণ্ঠন সমানতালে চলার আশঙ্কা নিয়েই সংসদ তার পথ চলবে। কিন্তু জনগণের কী হবে? ইতিমধ্যে অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ডিপ স্টেটের আকাঙক্ষা, পরিকল্পনা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন তৎকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। রাজনৈতিক বিতর্কের আগুনে ঘি দেওয়ার ভূমিকা পালন করছে তাদের এসব বক্তব্য। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো দেশের বিপক্ষেই যায় সবসময়। তেলের রিজার্ভ এবং সংগ্রহ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ঋণ আর দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে যেখানে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ দরকার সেই সময় সংসদ কি তার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করবে?

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত