যুদ্ধের প্রভাবে সংকটে সার আমদানি

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৮:১২ এএম

ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া সংকটে ব্যাহত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এক লাখ টন করে দুটি দরপত্র আহ্বান করেও তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। পরে ধরন পাল্টে নতুন দরপত্র দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে সরবরাহকারীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহনের সংকট অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী সারের ব্যাপক দাম বেড়ে যাওয়া। দুয়ে মিলে সরবরাহকারীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে অনীহা। সব মিলে আমন মৌসুমের সরবরাহ নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে সারের দর, সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত ম্যাগাজিন আরগুস সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে শুধু ইউরিয়া সারের ক্ষেত্রেই দাম বেড়েছে টন প্রতি প্রায় ৩০০ ডলার পর্যন্ত। যা এখন ৭০০ ডলারের কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাপকভাবে দাম বেড়েছে ডিএপি ও টিএসপির। সম্প্রতি ৭০০ ডলার থেকে বেড়ে ডিএপির দাম ৮৫০ ডলার এবং ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে টিএসপির দাম ৬৫০ ডলারে উঠেছে। চায়না রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে ইউরিয়া ও ডিএপির দাম আর বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে পরিবহনের বাড়তি খরচ। যা কৃষি খাতে সারের সরবরাহের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) তাদের বছরের শেষ ভাগের নন-ইউরিয়ার সংগ্রহ কার্যক্রম গুটিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে। বিসিআইসি ইউরিয়ার দরপত্রে পরিবর্তন আনছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি ইউরিয়া আমদানির জন্য নিবন্ধিত ১৭ সরবরাহকারীকেই আমদানির সুযোগ দিত। যেখানে এখন উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রদান করা হয়েছে। যাতে বিশে^র যেকোনো দেশের, যেকোনো সরবরাহকারী এতে অংশ নিতে পারে।

জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার ও আরব আমিরাত থেকে সার আমদানি করে বাংলাদেশ। কাতার ও আমিরাত থেকে শুধু ইউরিয়া এবং সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া ও ডিএপি আনা হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎসগুলো থেকে বেশি পরিমাণ সার আমদানির কথা ভাবছে সরকার। বিকল্প দেশের তালিকায় রয়েছে চীন, মিসর, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ। কারণ মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে রাশিয়া এখন বৈশি^ক বড় সরবরাহকারী তালিকায় উঠে এসেছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকল্প উৎসগুলোতেও সংকট রয়েছে। চায়না আপাতত সার রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ তারা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিজেদের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। এরপর সুযোগ থাকলে রপ্তানি করবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে সার আমদানি করতে পারবে না। কারণ রাশিয়ার আমদানির ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

বাংলাদেশের আমদানিকারকরা বলছেন, এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশে^র। কারণ সরবরাহকারী দেশের রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় আমদানিকারক দেশগুলো এখন বাংলাদেশের মতোই বিকল্প উৎসের পেছনে ছুটছে। তারা বলছে, শুধু সরবরাহ বন্ধ হয়েছে তাই নয়, সার উৎপাদনের যে সব কাঁচামাল সেগুলোর সরবরাহ না থাকলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সার সরবরাহ নিয়ে সংকট থাকবে। যার একটা বড় প্রভাব আসবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ওপর।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বোরো মৌসুমে সারের কোনো সংকট নেই। আমাদের চিন্তা জুলাই-আগস্টে শুরু হওয়া আমন নিয়ে। সেজন্য আমাদের এখনই সারের সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য মনোযোগী হতে হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী আমরা কাজ শুরু করেছি। সম্ভাব্য সব ধরনের বিকল্প উৎসগুলো থেকে আমদানি করা যায় কি না সেটা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।

তিনি বলেন, দুবাইয়ের সঙ্গে জিটুজি চুক্তি রয়েছে। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশকে তিন লাখ টন সার সরবরাহ করবে। তবে এর জন্য জাহাজ চলাচলের অনুমতিসহ যত প্রক্রিয়া সেটা বাংলাদেশকে সামলাতে হবে। এ জন্য কাজও শুরু হয়েছে।

একইভাবে রাশিয়া থেকে আমদানিতে আমেরিকার যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সেটা দূর করা যায় কি না তা নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা এটা নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান বিসিআইসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, আমরা একটা উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছি, যাতে এখানে যেকোনো সরবরাহকারী অংশ নিতে পারেন। সিঙ্গাপুরভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে। তারাও যাতে এখানে আসতে পারে।

এদিকে গতকাল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক সভার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, গ্যাসের সরবরাহ পেলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঘোড়াশাল পলাশ ইফরিয়া সার কারখানা চালু করা হবে।

জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর ২৬ লাখ টন ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বিসিআইসির নিজস্ব কারখানাগুলোর মাধ্যমে প্রতিবছর ১০ লাখ টনের মতো উৎপাদন করার চেষ্টা করে থাকে। বাকিটুকু আমদানি করতে হয়। যদি গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রেখে পুরোটাই নিজের দেশের উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

তবে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে তখন প্রথমেই সবগুলো সার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরে শুধু শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি চালু হয়েছে। বাকি চারটি ইউরিয়া এবং একটি ডিএপি ও একটি টিএসপি উৎপাদনকারী কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে।

অথচ ইউরিয়া এবং নন ইউরিয়া মিলে প্রতি বছর ৬০ লাখ টনের বেশি সারের চাহিদা রয়েছে। নন-ইউরিয়া সার বিএডিসি ও বেসরকারি আমদানিকারদের মাধ্যমে আমদানি করা হয়ে থাকে। এসব সারের বেশিরভাগই ব্যবহার হয় বোরো এবং আমন মৌসুমে। এই দুটি মৌসুমের চাল উৎপাদন দিয়েই দেশের সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তার ভিত তৈরি হয়। কারণ এই দুই মৌসুমে প্রায় ৪ কোটি টন চালের সরবরাহ আসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সার নিয়ে ক্রাইসিস হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তার মধ্যেও আমরা দেশের কারখানাগুলো খোলা, বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করাসহ নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছি। সবটাই করছি আমন মৌসুমকে সামনে রেখে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানিতে সংকট যুদ্ধের শুরু থেকেই তৈরি হয়েছে। ইরান বাংলাদেশের জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও কোন দেশ থেকে আমদানি হচ্ছে সেখানে একটা জটিলতা রয়েছে। তবুও সবগুলো বিষয় আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত